Leave a comment

পুরুষের পৌরুষ এবং নপুংসকের পৌরুষ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের চার ফাস্ট বোলার তত্ত্ব এবং তার হাত ধরে টানা প্রায় ২০ বছর(’৭৬-‘৯৫) ক্রিকেট দুনিয়ার একমাত্র “মাস্তান” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার পিছনের কারনটা অপমান, ভয়, বর্ণবাদ, কলোনিয়াল অত্যাচারের জবাব দেয়ার তাড়না। ১৯৬০ সনে ফ্রাংক ওরেল ক্যাপ্টেন হওয়ার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে কোনো “কালো”কে ক্যাপ্টেন করা হতোনা।১৯৭৫ সনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া সফর করতে গিয়ে শুধু বাজেভাবে সিরিজই হেরে আসেনা, সাথে করে নিয়ে আসে হিউমিলিয়েশন, লিলি-থমসনের আতংক। গ্যালারি থেকে চিৎকার, “লিলি-লিলি-কিল, Lilli-Lilli-KILL” আর ব্যাটসম্যানের দিকে লিলি-থমসনের বাউন্সারের পর বাউন্সার। টেল এ্যান্ডারদেরকেও মাফ করতোনা। একদিন খেলা শেষে ল্যান্স গিবস ডেনিস লিলিকে
বলেছিলেন, “শোনো, আমার স্ত্রী আর সন্তান আছে, তুমি যা করছো সেই ব্যাপারে একটু সতর্ক হও।” এখান থেকেই স্পষ্ট যে ব্যাটসম্যানরা কী পরিমাণ আতংকে ভুগত। সেই সিরিজে চরমভাবে অপমানজনক পরাজয়ের পর কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার টেকনিক ঠিক করেন ক্লাইভ লয়েড। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোণা কোণা থেকে রিয়েল ফাস্ট বোলার খোঁজা শুরু করেন। এ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং, জুয়েল গার্নার,কলিন ক্রফটদের মাধ্যমে পৃথিবী প্রথম (হতে পারে শেষও) বারের মতো একই দলে চারজন ফাস্ট বোলার দেখতে পায় যাদের চারজনই ৯০+ মাইল গতিতে বল করতে পারে। লিলি-থমসনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না উঠলেও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিকি উঠে। তারা ক্রিকেট মাঠে গুন্ডামি করছে, বাউন্সার বন্ধ করো নানা ধরনের কথা তুলে ইংলিশ প্রেস। কারন? ইংল্যান্ডকে ইংল্যান্ডের মাঠে ৫-০ তে “ব্ল্যাকওয়াশ” করে তারা। হ্যা, “ব্ল্যাকওয়াশ” শব্দটাই ব্যবহার করে তারা। কালোদের এই উত্থান প্রথমে না মানলেও একসময় পুরো বিশ্বই মেনে নিতে বাধ্য হয়। না মেনে উপায় আছে কোনো বলেন? ভিভ রিচার্ডস পাছায় ব্যাট দিয়ে মেরে মংগল গ্রহে পাঠিয়ে দিবেনা :P। যে অস্ট্রেলিয়াতে অপমানিত , নিগৃহীত হয়ে এসেছিলো সেই অস্ট্রেলিয়াতেই ’৭৯-’৮০তে সিরিজ জিতে আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। লিলি-থমসনদের টোটকা এইবার উল্টো অস্ট্রেলিয়াকেই খাইয়ে দেয়। তাদের রাজত্বের অবসান ঘটে অস্ট্রেলিয়ার মাধ্যমে ’৯৪-৯৫ এ। যেই সিরিজটিকে সবাই অলিখিত বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ সিরিজ ঘোষণা করে। ইন্ডিজের মাটি থেকে ৪ টেস্টের সিরিজ ২-১ এ জিতে আসে অস্ট্রেলিয়া। সিরিজটি বিখ্যাত হয়ে আছে স্টিভ ওয়ার সাথে কার্টলসি এ্যামব্রোসের লড়াই এর কারনে। জিততে মরিয়া ইন্ডিজ ফাস্ট বোলিং ব্যাটারির বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়ে যান স্টিভ। একের পর এক বাউন্সার হজম করেন, গায়ে অসংখ্য আঘাত নিয়েও দলকে তিনি ঠিকি বাঁচিয়ে দেন। এরপর শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার রাজত্ব। তবে অস্ট্রেলিয়ার রাজত্বটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো রোমান্টিসিজমে পূর্ণ না। বরং তা হচ্ছে ক্রিকেটকে অস্ট্রেলিয়া যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছে তার ফল। জুনিয়র লেভেল থেকেই তারা ক্রিকেটারদের টাফ ক্রিকেট শিখায়। সেই টাফনেস থেকেই বের হয়ে আসে ম্যাকগ্রা,শেনওয়ার্ন,ব্রেটলি অথবা গিলক্রিস্ট,হেইডেন,পন্টিং,স্টিভ’রা । অস্ট্রেলিয়ার রাজত্বটাকে বলতে পারেন ফলের চিন্তা না করে নিয়ম এবং শৃংখলার মাধ্যমে স্কিলফুল ক্রিকেটার তৈরি করার মিশনের ফল। সেই রাজত্বও শেষ হয় ২০০৫/০৬ এর দিকে।

শুধু অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজই না। ক্রিকেটে আরও অনেক রেভ্যুলেশন ঘটেছে। যেমন ধরেন ওয়াসিম-ওয়াকারের হাত ধরে রিভার্স সুইং নামের ভয়ংকর বলের উদ্ভভ। ওয়াকারের ইনসুইংগিং ইয়র্কারের আঘাতে ব্যাটসম্যানদের পায়ের আংগুল ভেঙ্গে যাওয়ার বদৌলতে কাউন্ট্রিতে ঐ বলের নামই হয়ে গিয়েছিলো, “টোস ব্রেকার”। ব্যাটস্যাম্যানরা জুতোতে বুড়ো আংগুলের উপর আলাদা চামড়া লাগিয়ে আসতেন শুধু ওয়াকারের রিভার্স সুইং এ আংগুল বাঁচাতে! আরও আছে। ১৯৯৬ পুরো বিশ্বকে হতবাক করে জয়সুরিয়া-কালুভিথারানা নামের দুই গুন্ডার আবির্ভাব ঘটে। যারা ভয়-ডর কাকে বলে জানেনা। ওভারের প্রথম বলকেই উড়িয়ে আছড়ে ফেলে মাঠের বাইরে। ওয়ানডে ক্রিকেটটাই পালটে যায়। এমন অসংখ পরিবর্তন ঘটেছে ক্রিকেটে যুগে যুগে। কেউ সমালোচিত হয়েছে, কেউ এপ্রিশিয়েটেড হয়েছে কিন্তু এটি সত্য সবাই-ই তখন ঘটনাগুলা যারা ঘটাচ্ছে তাদের দিকে ভয়ে তাকাত।সেরা সময়ের ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ার সামনে খেলার আগে সব দলই দুরু দুরু বুকে নামতো। ইজ্জত নিয়া কথা। ওয়াসিম ওয়াকারের ইয়র্কার সামলাতে ব্যাটসম্যানরা অথবা জয়া-কালুর মাইরের হাত থেকে বাঁচতে বোলাররা দোয়া কালাম পড়ে কাজ শুরু করতেন। ইন্ডিয়াতেও শচীন-দ্রাভির-গাংগুলি-লক্ষন-শেবাগ-যুবরাজ এই লাইন আপ দেখে যে কোনো বোলিং ডিপার্টমেন্টের শিরদাঁড়া কেপে উঠতো।

বর্তমানেও একটি দল এমন বীরত্ব দেখাচ্ছে। তারা আইপিএল নামের একটা টুর্নামেন্ট করে পৃথিবীর সব গ্রেটদের ডাগ আউটে বসিয়ে রাখে। সারা বছর খেলে যে টাকা পায় সেই টাকা তারা এক ম্যাচেই দেয়। ক্রিকেট বাণিজ্যের যে দর্শক তার দুই তৃতিয়াংশই তাদের দেশের। তাই তারা ঠিক করে কীভাবে খেলা হবে, খেলাতে পিচ কেমন হবে, খেলাতে কত টাকার জুয়ার ভাগ হবে। টিভিস্বত্ত্ব থেকে শুরু করে মাঠের ইনকাম সবই তাদের দখলে। তাদের দর্শকরা খেলা না দেখলে টিভি মালিকরা খেলা দেখাবেনা। তাই তাদের তুষ্ট করতে খেলার আইনে বদল ঘটে। বোলারদের সৎ ভাই বানানো হয়। অ্যাম্পায়ারদের চোখ বন্ধ করে সিদ্ধান্ত দিতে হয়। টুর্নামেন্ট বাঁচিয়ে রাখতে হলে এদের টুর্নামেন্টে থাকা লাগবেই। তাই এরা এখন মাস্তান।

তবে পার্থক্যটা হচ্ছে আগের মাস্তান বা বীরদের দিকে আমরা সম্মান নিয়ে তাকাতাম, অপজিশন ভয় নিয়ে খেলতে নামতো। আর এখনকার এই কর্পোরেট বা মহাজনদের নিয়ে যারা মাস্তানি করছে তাদের দিকে আমরা একরাশ ঘৃণা ভরে তাকাই। টাকার প্রয়োজনে মহাজনের কাছে যেতে হয় হয়ত দরিদ্র কৃষককে। কিন্তু দিনশেষে সেই কৃষকটি মহাজনকে “খা*** পোলা” বলে সম্বোধন করে। ক্লাইভ লয়েড, রিকি-পন্টিং,জয়া বা ওয়াকার,শচীনের নামটা আমরা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবো কিন্তু ধোনি, কোহলিদের নামটা বলে মুখ থেকে একদলা থুথু ফেলবো… এটাই হচ্ছে পার্থক্য।

এটাই হচ্ছে “শ্রেষ্ঠত্ব” আর “বাণিজ্যিক শ্রেষ্ঠত্বে”র মাঝে পার্থক্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: