Leave a comment

মাদ্রাসা শিক্ষা নৈতিকতা তৈরিতে ব্যার্থ

সমাজে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সবচাইতে বেশি প্রচলিত মতবাদটি হল,ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখায়। ধর্মীয় নৈতিকতার মূল ভিত্তি হচ্ছে ভয়। অন্যায় প্রতিরোধে,সমাজে শৃংখলা রক্ষার্থে ভয় খুব একটা মন্দ অস্ত্র নয়।সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শাস্তির মাধ্যমেই মানুষকে অন্যায় থেকে দূরে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান যদিও এর বিপরীতে কিছু নতুন নতুন তত্ত্ব আনার চেষ্টা করছে কিন্তু তারপরও জেল জরিমানা,পুলিশের মাইর অন্যায় প্রতীরোধে অনেকটাই সফল সে কথা অনস্বীকার্য। যার প্রমান, যে দেশে ল এন্ড অর্ডার যত ভালো সে দেশে অন্যায়,দূর্নিতীর হার কম জীবনের নিরাপত্তা বেশি। ধর্মেও ঠিক একই প্রসেস ইউজ করা হয়। কিন্তু বাস্তব জগতের সাথে তার মৌলিক পার্থক্য হল,ধর্মীয় শাস্তিগুলো ইহজাগতিক নয় পরজাগতিক। অন্যায়ের শাস্তি দেয়ার জন্য কোন ঈশ্বর স্বয়ং ধরনীতে আগমন করেছেন এমন কোন ঘটনার সন্ধান এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। শাস্তিকে আমি তখনই ভয় পাব যখন আমি সেই শাস্তি ভোগ করব বা সেই শাস্তি কাউকে ভোগ করতে দেখব। কিন্তু অদেখা/অজানা এক শাস্তিকে ভয় পেয়ে আমি অন্যায় করবোনা এই তত্ত্ব মেনে নেয়াটা আসলেই কঠিন। আমার এই লেখাটার মূল উদ্দেশ্য এই জায়গাইতেই। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা কি মানুষকে নৈতিক ভাবে শক্ত করতে পারে?নাকি নৈতিকভাবে শক্ত মানুষ তৈরি করার জন্য অন্য কিছু প্রয়োজন?

মূল আলোচনাতে যাওয়ার আগে কিছু তথ্য জেনে নিলে ভালো হয়। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য আমাদের দেশে দুই ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা প্রচলিত আছে। প্রাইভেট সেক্টর দ্বারা পরিচালিত ‘কওমি মাদ্রাসা’ আর সরকার দ্বারা পরিচালিত ‘আলিয়া মাদ্রাসা’। ২০০৬ এ প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী অনুযায়ী দেশে কাওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৫ হাজার যাতে শিক্ষার্থী আছে ৪০ লাখের উপর,তবে আমরা যদি রেজিস্টার্ড বিহীন মাদ্রাসার সংখ্যাও আমলে আনি তবে তার সংখ্যা ৬৪ হাজারের বেশি। সেখানে সরকারী আলীয়া মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের মত যাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।আলীয়া মাদ্রাসগুলোতে সরকারি কারিকুলাম ফলো করা হয়।ধর্মীয়,আরবী শিক্ষার সাথে সাথে অন্যান্য বিষয়ও এখানে মোটামোটি গুরুত্ব সহকারেই পড়ানো হয়। তাই কওমি মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থীই পরবর্তীতে সরকারী/বেসরকারী ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে ,এমনকি আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোতে মানবিক এবং সোস্যাল সাইন্সের ৩২% শিক্ষকই বিভিন্ন আলীয়া মাদ্রাসা হতে পাসকৃত। গোলটা বাধে কাওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে। যদিও তারা সরকারী কোন কারিকুলাম মানেনা তারপরও তাদের দাওরা ডিগ্রীকে ২০০৬ সনে মাস্টার্স সমমানের এর সম্মান দেয়া হয়েছে। ব্যাপারটি কি পরিমান হাস্যকর সেটা বুঝার জন্য আসুন কাওমি মাদ্রাসার সিলেবাস টি একটু জেনে নিই।

ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের একটি পর্যায়ে এ দেশের হক্কানী আলেম-ওলামারা দ্বীনের মৌলিকত্ব ধরে রাখার প্রয়াসে বর্তমান ধারার কওমি মাদ্রাসাগুলো গড়ে তোলেন। এখন বেশিরভাগ কওমি মাদ্রসাগুলো যে সিস্টেম ফলো করে যাচ্ছে তার নাম, দারস-ই-নিজমী। মুল্লা নিজামউদ্দিন মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনার নিমিত্ত্বে এই কারিকুলাম তৈরি করেছিলেন। পড়ার মাধ্যম এইখানে মূলত আরবী,ফারসি আর উর্দু।এতে মূলতযা পড়ানো হয় হয় তার মাঝে ফারসি,আরবী,উর্দু ভাষার অলংকার তত্ত্ব,ছন্দতত্ত্ব,সাহিত্য, ইসলামী আইন কানুন,হাদিস শরীফ এইগুলাই মুখ্য। ৮ম শ্রেনীর পর থেকে বাংলা অপশনাল করা হয় এবং বেশিরভাগ ছাত্রই বাংলা নেয়না কারন বাংলাতে নম্বর উঠে কম।যদিও ৭১’পরবর্তী সময়ে বাংলা মাধ্যমে পড়ানোর প্রচেষ্টা শুরু হয় কিন্তু সরকারী কোন বাধ্যবাধকতা না থাকায় সেটা মাদ্রাসার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

এইসকল মাদ্রাসা থেকে যে সকল শিক্ষার্থী বেরুচ্ছে তারা আসলেই নৈতিকভাবে কতটুকু ভালো মানুষ হিসাবে বেড়ে উঠে? মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র/ছাত্রী যৌননির্যাতনের খবর মোটামোটি কিছুদিন পরপরই পত্রিকাতে দেখতে পাই আমরা।ছাত্ররা নিজদের মাঝে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে এমন উদাহরনও বিরল নয় বরং খোজ নিলে প্রচুর পাওয়া যায়। আমার ২ জন বন্ধু যারা কাওমী মদ্রাসাতে কিছুদিন হলেও পড়াশোনা করেছে তাদের ব্যাক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি তা। মসজিদে গরীবের জন্য দান করা টাকার কতভাগ আসলেই গরীবের হাতে যায় আর কত ভাগ ইমাম,মুয়াজ্জিনের পকেটে তার খোজ কজনে নেয়?প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর দেশের জন্য ২মিনিট দোয়া করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রতি আর কোন ধরনের দায়বদ্ধতা কি কখনো পাই আমরা এদের কাছে থেকে? কোন ধরনের নৈতিক শিক্ষা তাহলে পেয়ে এসেছে এরা?

যৌনতা মানুষের জৈবিক চাহিদা। যে কোন নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই মানুষের আকর্ষন বেশি থাকে। সেইখানে যদি আপনি কারো জৈবিক চাহিদার দ্বার বন্ধ করে রাখেন তাহলে সেটা মানসিক বিকারের দিকে যেতে বাধ্য। আপনাকে ২দিন না খেতে দিলে আপনি সামনে ঘাস পেলে ঘাসই খেয়ে ফেলবেন। এর জন্য যদি কেউ আপনাকে দোষ দেয় সেটা কি ঠিক হবে? মাদ্রাসার ছাত্ররা কখনোই কোন নারী সংগ পায় না। এছাড়া নারীদের নিয়ে এমন একটি ধারনা তাদের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে,নারী মানে হলো একটা ‘খাবার জিনিস’,তাই তাকে বাক্সের ভিতর রাখতে হবে। মাঝে মাঝে বের করে চেটেপুটে খেতে হবে। যার ফলে নারীর প্রতি ভয়ংকর রকমের নেগেটিভ ধারনা নিয়েই বেড়ে উঠে এই ছেলেগুলো। আর অবরুদ্ধ যৌনানুভিতকে তৃপ্ত করতে হয়ত নিজেরা নিজেরাই পার্টনার হয়ে যায়। শিক্ষকরা ছাত্র/ছাত্রীর উপর যৌন নির্যাতন চালায়। অথচ এই কাহিনী আমরা সমাজের অন্য ক্ষেত্রে এত বেশি হারে দেখিনা।পাপের কথা কিন্তু সবাই জানে,কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষা যেখানে সেই পাপ থেকে বিরত রাখতে পারেনা সেইখানে শুধুমাত্র স্বাভাবিক জীবন যাপনে থেকেই একজন সাধারন ধার্মিক সেই পাপ থেকে বিরত থাকতে পারে।

মাদ্রাসাতে বাংলা সাহিত্য পড়েনা(আউট বই পড়লে নাকি ঈমানের জোড় কমে যায়),এমনকি পেপার পত্রিকাও তাদেরকে পড়তে উতসাহিত করা হয়না বরং নিষেধ করা হয়। একটা বাচ্চা যদি সাহিত্য না পড়ে,সমাজ বিজ্ঞান না পড়ে তবে কি তার পক্ষে সুস্থ,সামাজিক মনন নিয়ে বেড়ে উঠা সম্ভব? একজন মাদ্রাসার বাইরে পড়া ধার্মিক কখনো ভাবতেই পারেনা যে মসজিদে দেয়া টাকা সে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করবে ,তার বিবেক তাকে এই কাজ করতে দেয় না। কিন্তু মাদ্রাসা পাস হুজুর কিন্তু ঠিকি সেই টাকা দিয়ে টিভি কিনেন।তার বিবেক তাকে বাধা দেয়না। ধর্মীয় শাস্তির কথা কিন্তু দুই ধার্মিকই জানেন। তাহলে এই আচরনগত পার্থক্যটা গড়ে দিল কি? সামাজিক শিক্ষা। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা কখনোই নৈতিকতা গড়ে দিতে পারেনা।।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: