Leave a comment

সম্পর্ক

“একটা মজার জিনিস বলি তোমারে। ২৩ এই সংখ্যাটা খুব মজার একটা সংখ্যা।বাচ্চা জন্মানোর সময় বাবা মা’র ২৩ জোড়া ক্রমোজম লাগে। ২৩ নাম্বার ক্রমোজম ঠিক করে তুমি ছেলে হবা না মেয়ে হবা। রক্ত সারা শরীরে একবার ঘুরে আসতে ২৩ সেকেন্ড টাইম নেয়। মায়ানরা মনে করতো যে দুনিয়া ২০১২সনের ২৩শে ডিসেম্বর ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবীর কক্ষপথ ২৩ ডিগ্রতে গিয়া আটকে আছে। ২ রে যদি তুমি ৩ দিয়া ভাগ করো তাহলে দশমিক ৬৬৬ পাওয়া যায়। বাইবেলে আছে ৬৬৬ হচ্ছে শয়তানের নাম্বার। আরো কিছু মজার কথা কই শোনো… ”

“মেহেদি ভাই চা খান”

“চা? আচ্ছে দিতে বলো চা। সাথে সিগারেটও দিতে বলো। কি যেনো বলছিলাম? ও ফিবোনাক্কি সিরিজ। অনেকে এইটাকে ঈশ্বরের নাম্বারও বলত আগে। এখন ত আর কেউ ঈশ্বর মানেনা তাই এইটাকে গোল্ডেন নাম্বারও বলে। দুনিয়ার সবকিছুতেই তুমি এই সিরিজ পাবা। আমাদের শরীরের অনুপাত,পারফেক্ট চতুর্ভজের অনুপাত,ফুলের পাপরি,মৌমাছির চাক সবকিছু এই সিরিজ মাইনা চলে। এই সিরিজের পরের সংখ্যারে আগের সংখ্যা দিয়া ভাগ করলে আমরা পাই দশমিক ৬১…এই সংখ্যাট খুবি গুরুত্বপূর্ণ…”

“মেহেদি ভাই, চা নেন,সিগারেট ধরেন।”

“হুম দাও।কি যেনো বলতেছিলাম? ও পাই। এই পাই হচ্ছে…”

“মেহেদি ভাই আজকে আসি,আরেকদিন শুনবনে আপনার পাইরে কেমনে পাইতে পায় হে হে।”

মেহেদি এলাকার নামকড়া পাগল। বুয়েটের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ত। কেমনে কেমনে জানি পাগল হয়ে গেছে। সারাদিন মানুষকে সংখ্যাতত্ত্ব বোঝায়। মাঝে মাঝে গাছের উপর উঠে নিউটনের সূত্রে ভুল বাইর করে। সাধারনত সে খুবই ভালো মানুষ। তবে মার্চ -এপ্রিলের দিকে মাথা বেশি গরম হয়ে যায়। তখন কেউ যদি ফিবোনাক্কি সিরিজের গল্প করার সময় উঠে চলে যায় তাহলে খবর আছে! মাইর মিস নাই। সেই সময় তাই তাকে বেঁধে রাখতে হয়। বাকি সময় কোনো সমস্যা নাই। ঘুরে ফিরে, এ ও চা সিগারেট দেয় সেটা ফুকে আর সবাইকে সংখ্যার রহস্যময়তা বোঝায়। যখন কাউকেই পায়না তখন গাছকে অংক শিখায়। সেইদিন পাবলু দেখে মেহেদি ভাই গাছকে নামাজ পড়ার ফজীলত বোঝাচ্ছে। নামাজ না পড়লে তাদের যে দোযকের জ্বালানী বানাবে সেটি বোঝাচ্ছে। আল্লাহ খালি মানুষের জন্য নবী রাসুল পাঠাইছে কিন্তু গাছের জন্য কোনো নবী আসে নাই এই ব্যাপারটা নিয়ে সেইদিন বিরাট বিরক্ত ছিলেন মেহেদি ভাই।কুকুর,বিড়াল,সাপ কচ্ছপ, গাছ সবাই-ই ত জীব। বিবর্তন হয়ে মানুষের বুদ্ধি না হয় একটু বেশি হয়ে গেছে। তাই বলে খালি মানুষের কাছেই ঈশ্বর মেসেঞ্জার পাঠাবেন আর বাকি জীবজগতের কাছে কেউ আসবেনা, এইটা ভারী অন্যায় বোধ হচ্ছে মেহেদি ভাইয়ের কাছে। তাদের পাপ পুণ্যের রাস্তা না দেখায়ে পাপী বানানোটা ভীষন অন্যায়! আজকে অবশ্য পাবলুর তেমন কোনো কাজ নাই। চাইলে সে আজকে মেহেদি ভাইকে সময় দিতে পারত। পাগলদের সাথে টাইম পাস করা অনেক বিনোদনের। পাগলের সাথে মন খুলে কথা বলা যায়, যা খুশি রসিকতা করা যায়। পাগলরা মাঝে মাঝে খুব চমৎকার আইডিয়াও দেয়। আজকে যেমন পাবলু যে কাজটি করতে যাচ্ছে সেই আইডিয়াটাও কিন্তু এই মেহেদি পাগলার কাছ থেকেই পাওয়া।

“ভাইয়া আমি ব্যবসা করব। চাকরি বাকরির চেষ্টা আর করতে পারবোনা। দুই বছর ধরে ত করেই যাচ্ছি। বিসিএসে ত চান্স পাবোনা আর পেলেও পরে রিটেন,ভাইভা কোথাও না কোথাও বাদ পরবই।” ভাত খেতে খেতে আলোচনা শুরু করল পাবলু। পাবলুর বড় ভাই মোহিত। উনি ম্যাডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি করেন।চাকরিতে তেমন প্রসার করতে পারেননি। একরোখা মানুষ। যে চাকরিতে বস আর ডাক্তারদের তেল মারাটাই যোগ্যতার মাপকাঠি সেখানে তিনি এমন একরোখা চরিত্র নিয়ে কিভাবে যে টিকে আছেন সেটা এক বিরাট রহস্যের ব্যাপার। কিছুটা হোচট খেলেন মোহিত পাবলুর কথা শুনে। “সরকারী চাকরি না করিস, বেসরকারী চাকরি করবি। সেইদিন যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে ব্যাংকে পরীক্ষা দিলি সেটার রেজাল্ট বেড়িয়েছে?”
“ধুর, ঐগুলা হবেনা ভাইয়া। সবজায়গাতেই মামা চাচা লাগে আর তা না থাকলে টাকা লাগে। আর টাকা দিয়ে মানুষের গোলামি করার ইচ্ছা নাই আমার। তাই ঠিক করেছি ব্যবসা শুরু করব।”
“ব্যবসা করব বললেই কি ব্যবসা করা যায় নাকি? আমাদের চৌদ্দ গুষ্ঠিতে কেউ ব্যবসায়ী নাই আর তুই করবি ব্যবসা? এইগুলা রক্তে থাকতে হয়। আর এই কিশোরগঞ্জের মানুষরে তুই চিনিসনা?মানুষের চাইতে নেতা বেশি। ২০টাকা কামাইলে ৩০টাকা চান্দাবাজি করে নিয়ে যাবে। ঐসকল চিন্তা বাদ দে। দেখি মাছের বাটিটা দে।” খেতে খেতে বলে যাচ্ছেন মোহিত। উনি বেশ খাদ্যরসিক মানুষ। চাকরিতে প্রসার না হলেও সমস্যা হয়না স্বচ্ছল জীবন যাপনে। বাপ-দাদার ফেলে যাওয়া বেশ কিছু সম্পত্তি আছে গ্রামে। সেখান থেকে ভালোই ধান-গম পাওয়া যায়। পাটের চাষও হয় বেশকিছু জমিতে। খেয়ে পরে বেশকিছু টাকা থাকে। ব্যাংকে টাকা জমানোর তেমন কোনো আগ্রহ নাই উনার। যা আয় রোজগার করেন তার পুরাটাই পেটপুজা আর কেনাকাটাতে খরচ করে ফেলেন। আজকে যেমন ২০০০ টাকা দিয়ে এক রুই মাছ কিনে এনেছেন। দুই টুকরা খেয়ে তিন নাম্বার টুকরা খাওয়ার জন্য মাছের বাটি চাইলেন তাই।
নিজে এক টুকরা মাছ নিয়ে বাটিটি বড় ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল পাবলু, “সেই জন্যেই ত ঐ নেতাদের সাথে মিলে মিশে ব্যবসা করব। তারা ভাগ চাইবেনা, উল্টো ভাগ দিবে।”
মাছের টুকরা মুখে নিয়ে কামড় বসাতে ভুলে গেলেন মোহিত,”মানে কি? কি ব্যবসা করতে চাচ্ছিস তুই?”
“ কন্ট্রাকটারির লাইসেন্স বিক্রি হবে একটা। ঐটা কিনব ভাবছি।”
এইবার খেপে গেলেন মোহিত, “কন্ট্রাকটারি? মানে ট্যান্ডারবাজি করবি তুই? এই জন্যে তুই অনার্স পাস করেছিস?”

ভাইয়ের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হলোনা পাবলুর। মাথা নিচু করেই বলে গেলো, “পাস করে কি লাভটা হলো? আমাদের সাথে পড়ত মজনু , মেট্রিকে ফেল করে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছিলো। সেই ছেলে এখন লাখ লাখ টাকার মালিক। আরো কত আছে এমন। আর আমি কি করলাম? পড়ালেখা করে চাকরির জন্যে ঘুরে মরতেছি। চাকরি পেলেই বা কি? কত টাকা বেতন পাবো? সেই টাকা দিয়ে কিভাবে চলব? এর চাইতে কন্ট্রাকটারি শুরু করে দিই। বালি ব্যবসাও করে মজনু। তার সাথে পার্টনারশিপে সেই ব্যবসাতে যোগ দিবো। ট্রাক কিনতে হবে দুইটা এই যা।”

২০০০টাকার মাছের স্বাদটি মনে হয় এখন তিতা ঠেকছে মোহিতের কাছে। বাংলা ভাষাতে শালীন গালির অভাব অনুভব করলেন হঠাত। স্ত্রীর সামনে ত আর চাইলেই অশ্লীল গালি দেয়া যায় না! তাই ভাষা না পেয়ে “এই মুহুর্তে আমার সামনে থেকে বিদায় হ। এলাকার গুন্ডা মজনুর সাথে তুই ব্যবসা করবি? ট্যান্ডারবাজি করবি? কন্ট্রাকটারির নামে সারাদিন ঐ গাঞ্জাখোড়গুলার সাথে ঘুরবি? এই জন্যে তুই অনার্স পাস দিছিস? এর চাইতে মেট্রিক পাস করেই শুরু করতি এইগুলা। যা আমার সামনে থেকে যা তুই।”
ঝগড়ার আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন মিসেস মোহিত,“আহা! খাওয়ার মাঝখানে এইসব কি শুরু করলে তোমরা? খেয়ে পরে আলাপ করলে হয় না? পাবলু, এই পাবলু খেয়ে যাও…”

কারো কোনো কথার জবাব না দিয়ে আধা প্লেট ভাত এঁটো করে চলে গেলো পাবলু। মাত্র ত ওপেনিং লিড দিলো । এখনো অনেক তাস আছে খেলার বাকি। টেক্কা দেখেই মোহিত ভাই যে রিয়্যাক্ট করলো! এরপর যখন কিং,কুইনও খেলে দিবে তখন কি করবে সেটি ভবে কিছুটা শংকিত হলেও সে খেলে যাবে। সামনে অনেক কাজ পরে আছে। অনেক অনেক টাকা দরকার তার।

চলবে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: