Leave a comment

নীলপরী

– আমি মরে গেলে কি করবে?

– সামান্য পিঠ ব্যাথায় মরবে বলে মনে হয়না, বড়জোর কুঁজো হয়ে যেতে পারো। তবে মরে গেলে কষ্ট ত হবেই । বুড়ো বয়সে আরেকটা প্রেম করা কঠিন হবে।

– তা কেনো হবে? মেয়েরা ত বুড়োদের প্রেমে পরার জন্য এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। আচ্ছা, ‘এই এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা’র মানে কি জানো?

– মনে হয় এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকলে দৌড় দিতে সুবিধা হয়। দেখোনা দৌড়ানোর বেলায় মানুষ এক পা তুলে থাকে।

– তাই নাকি? দেখিনি ত কখনও। ক্লিনিক থেকে বের হয়েই একটা দৌড় কম্পিটিশন দেখবো।

– ক্লিনিক থেকে বের হতে হবে কেনো? এখনই দেখিয়ে দিচ্ছি, ইউ টিউব আছে কি করতে?

– নাহ। তোমাদের ঐ মোবাইলের ছোটস্ক্রিনে ভিডিও দেখতে ভালো লাগেনা। হাতের তালুতে মানুষ দেখে কি যে মজা পাও তোমরা। ভিডিও দেখা লাগে ৫৬ ইঞ্চি স্ক্রিনে অথবা সিনেমা হলে। পুরো দেয়াল জুড়ে খেলা করবে মানুষ। মানুষগুলোকে দেখতে জীবন্ত লাগবে। মনে হবে আমার সামনেই দাঁড়িয়ে তারা। চাইলেই ঢুকে যেতে পারি কিন্তু এই মুহুর্তে তোমার হাত ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছেনা বলে ঢুকছিনা আর কী। হাতের তালুতে দেখবে লিলিপুটদের সিনেমা। হাতের তালুতে আসল মানুষদের ভিডিও দেখতে নেই।

– তোমার সবকিছুতেই খালি ‘বড়’ ‘বড়’ পছন্দ কেনো? সাইজটাই সব, দিলটা কিছু না?!

অমির হাতের বাহুতে সহ্যসীমার বাইরের একটি চিমটি কেটে আলাপে ছেদ টানলো নীলা। উহু মাগো বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো অমি। ‘এত জোরে চিমটি কাটে মানুষকে!’
‘তুমি আবার কবে থেকে মানুষ হলে? সুন্দরবন থেকে ছাড়া পেলেই বুঝি বানরেরা মানুষ হয়?’ বানর শব্দটা অমির মোটেও পছন্দ না। ‘বানর’ আর ‘গাধা’ দুটি শব্দে প্রচন্ড এ্যালার্জি অমির। প্রথম কারনটা ধর্মীয়। নাস্তিকেরা বলে বানর নাকি মানুষের পূর্বপুরুষ। অমি নাস্তিক সহ্য করতে পারেনা। নাস্তিকদের সুত্র ধরে বানরেও তার বিরাট অরুচি। দ্বিতীয় কারনটা জাগতিক। স্কুলে অংকে কাঁচা থাকার দরুন অংক স্যার তাকে ‘গাধা’ ডাকত। স্কুল জীবনের নিকনেমগুলো জন্মদাগের মতো। স্কুল জীবনের সব স্মৃতি মুছে যাবে কিন্তু স্কুলে স্থায়ী হয়ে যাওয়া ডাকনাম পিছু ছাড়বেনা। ‘গাধা’ নামটাও তার পিছু ছাড়েনি। স্কুলের বন্ধুদের সাথে এখন যোগাযোগ নেই। সত্য বললে এক শাহেদ ছাড়া অমির আর কোনো বন্ধু নেই। শাহেদ আর নীলা ছাড়া আর কারো সাথেই প্রান খুলে কথা বলতে পারেনা অমি। স্কুলের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ না থাকলেও মাঝে মাঝে স্বপ্নে ‘অংক বড় বাঁধা, অমি একটা গাধা’ কোরাস শুনে ঘুম ভেংগে যায় তার। জীবনে কখনও গাধা না দেখলেও গাধা তার চিরশত্রু তাই। পরকালের চাইতে ইহকাল সর্বদাই বেশি প্রবল। ‘গাধা’ আর ‘বানরে’র মাঝে তাই গাধাকেই অমির বেশি অপছন্দ। তাই গাধা হচ্ছে নীলার শেষ আশ্রয়। এই মুহুর্তে অমির অন্যায়টা ‘গাধাস্কেল’ পরিমান হয়নি। গতকাল না হয় ভুল করে বলেই ফেলেছিলো যে পর্নো সিনেমাগুলোতে পুরুষদের ঐ জিনিস এত বড় হয় কেনো। তাই বলে এটি নিয়ে এখনও খেপানোটা অমির কেমন আচরন? না জানলে মানুষ জিজ্ঞাস করতে পারেনা? না হয় একটু ছেলেমানুষিই করেছে, তাতে কি? সে ত আর ছেলেদের মতো পর্নো দেখে দেখে বড় হয়নি। অমির চাপাচাপিতে দেখতে রাজী হয়েছিলো। জীবনে এত সিনেমা দেখা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি নিয়েও ত কত সিনেমা হয়েছে, একটা দুইটা পর্নো দেখলে কী আর হবে? সে ত আর যার তার সাথে বসেও দেখছেনা। অমির সাথে বসে দেখেছে। সিনেমাতে সবগুলা নায়ক এইভাবে কলাগাছ গায়ে করে বেড়ালে সে জানতে চাইবেনা? এরপর থেকে শুরু হয়েছে অমির যন্ত্রনা।

– কী? বানর ? আমি বানর? তুমি তাহলে জলহস্তী।

– আমি মোটেও মোটা না। জলহস্তীর সাথে আমাকে তুলনা করলে বরং জলহস্তীদেরই লাভ। খুশি হয়ে তারা তোমাকে দুই একটা চুমুও দিয়ে দিতে পারে। কোলে করে নিয়ে নাচার সম্ভাবনাও আছে।

– তুমি মোটা, তুমি গাভীর মতো মোটা।

হাসতে লাগলো নীলা। ওষুধে কাজ করেছে। খেপে গেলে অমি খেই হারিয়ে ফেলে। এমনিতে মানুষকে বিভ্রান্ত করে দারুন চটপটে উত্তর দেয়াতে সিদ্ধহস্ত হলেও খেপে গেলে সে একদম ৬ বছরের বাচ্চাদের মতো করে।

– তুমি যে কী মোটা তা জানো তুমি? তোমাকে মানুষ খালা ভাবে।

– অবশ্যই ভাবতে পারে। তোমাকে যে দাদা ভাবে সেটাও জেনে নাও।

হেসেই চললো নীলা। পরপর দু’টো ছক্কা মেরে দিয়ে ব্যাটসম্যান যে তৃপ্তি পায়, সেই তৃপ্তিও পাচ্ছে। অমি এখন পুরো খেই হারিয়ে ফেলেছে। প্রানী খুঁজে পাচ্ছেনা, তাই হাঁস মুরগীর সাথে তুলনা দিচ্ছে এখন। হাসির দমক থামছেনা নীলার। হেসেই যাচ্ছে নীলা, হেসেই যাচ্ছে নীলা। নীলাকে দেখতে ঠিক নীলপরীদের মতো লাগছে অমির কাছে । নীলপরী দেখা হয়নি। তবে সম্ভব হলে একটা নীলপরীর সাথে নীলার হাসির একটা ‘চ্যালেঞ্জ গেম’ আয়োজন করা যেতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে হাসার সময় নীলপরীকে তারা ডানা খুলে রাখতে হবে। না খুলতে পারলে ডানা ঝাপটানো চলবেনা। হাসির সৌন্দর্য শুধু মুখেই না। হাসির সৌন্দর্য শুধু চোখেও না। হাসির সৌন্দর্য পুরো শরীরে। বাংলা সিনেমার ভীলেনরা হাসে উপর নিচে মাথা ঝাকিয়ে, ঘুষখোর সরকারী চাকুরেরা হাসে ভুঁড়ি দুলিয়ে আর উন্মাদ যুবক হাসে পৃথিবীকে মধ্যাংগুলি দেখিয়ে। হাসির সৌন্দর্য তাই শুধু ঠোটে বা মুখেই না। যারাই নীলপরীদের হাসির গুনকীর্তন করেছেন তারা অনেকেই হয়ত হাসির সাথে ডানা ঝাপটানো দেখে বিভ্রান্ত হয়েছেন। নীলপরীর হাসিকে স্বর্গীয় বলেছেন। এটি বুঝতে পারেন নি যে হাসিটার অর্ধেক সৌন্দর্য ছিলো সেই নীল ডানাতে। নীলপরীর সাথে নীলার হাসিতে তাই নীলপরী ডানা ঝাপটাতে পারবেনা। দেখি সুন্দরী তুমি কত সুন্দর হাসতে পারো! নীলা হাসতে হাসতে হেঁচকির মতো তুলে ফেলেছে। ইচ্ছে করেই নিজের বোকামিটা করেই যাচ্ছে অমি। নীলার এই হাসির জন্য সারাজীবন চিড়িয়াখানার খাঁচায় বানর সেজে বসে থাকতে পারে সে। নীলার হাসির দমক বেড়েই চলছে। নীলার চোখ যেনো বের হয়ে আসছে, বুকে চেপে ধরেছে নীলা কিন্তু ঠোঁটের কোনে হাসি লেগেই আছে। হাসছেই নীলা, হেসেই যাচ্ছে। হঠাত করে চেয়ার থেকে এক লহমায় নিচে পরে গেলো নীলা। দৌড়ে গিয়ে নীলার মুখটা তুলে ধরলো অমি। নীলার মুখটা যেনো রক্তশূন্য। শ্বাস ফেলছে কি নীলা? ‘ডাক্তার’, ‘ডাক্তার’ বলে চিৎকার করে উঠলো অমি। ইমার্জেন্সিতে বসে থাকলেও ছুটে আসার মতো পর্যাপ্ত ডাক্তার এই দেশের কোনো ক্লিনেকেই থাকেনা। রোগীর জীবনমৃত্যুর চাইতে ডাক্তারদের সময়ের অর্থমূল্য অনেক বেশি এই শহরে।


– আব্বু, কখন আসবা তুমি?

– এই ত তন্বী সোনামনি, কাজ শেষ হলেই চলে আসবো।

– আব্বু, আম্মুর অনেক অসুখ। আম্মু খুব চিৎকার করছে, আমার ভয় লাগছে।

– ভয়ের কিছু নেই তন্বী সোনা, এটা তেমন কোনো অসুখ না। একটু পরেই দেখবে তোমার আম্মু তোমার ছোট্ট আপুকে নিয়ে আসবে।

– ছোট্ট আপু আসলে আম্মুর এত কান্না করতে হয় কেনো? আমার আপু লাগবেনা, আম্মুকে ঠিক করে দাও।

– ভালো কিছুর জন্য একটু কান্না ত করতেই হয়। তুমি আইসক্রিম খাওয়ার জন্য কান্না করোনা? তোমার আম্মুও তেমনি তোমার ছোট্ট আপুর জন্য কান্না করছে সোনা। একটু পরেই দেখবে আম্মু হাসতে হাসতে আপুকে নিয়ে আসবে। আমিও আসছি। মামা মামিকে একদম জ্বালাতন করবেনা , কেমন? রাখি তন্বীসোনা।

ফোন রেখে দিলো অমি। শাহেদের সাথে আজকে তার সাপ্তাহিক “পান করা দিবস”। বছর চারেক আগে পানাভ্যাসটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিলো। শাহেদ অনেক চেষ্টা করে এখন সেটি সপ্তাহে একদিনে এনে ঠেকিয়েছে । অমি কোনো অবস্থাতেই মানতে রাজী ছিলোনা। অনেক চেষ্টার পরে এক শর্তে মেনেছে। এইদিন সে ইচ্ছামতো পান করবে। যত প্যাগ খুশি চালাবে, কোনো থামাথামির কথা আসবেনা। দরকার হলে বমি করবে, বমি করে আবার খাবে, আবার বমি করবে কিন্তু থামা চলবেনা। যতবার সম্ভব পাকস্থলি পুরে পান করতে হবে। কোনো সোডা না, কোনো সফট ড্রিংক্স না , শুধুই এ্যালকোহল চলবে এইদিন। চারটি বোতল কিনে এনে বসেছে তারা। অফিস বন্ধ করে ভিতরে দুই বন্ধু। বিকট সাউন্ডে নিরভানা গেয়ে চলছে, “র‍্যাপ মি মাই ফ্রেন্ড, র‍্যাপ মি এগেইন…” সিগারেটের ধুয়াতে রুমের অক্সিজেন অণুগুলো পালানোর নিরন্তর চেষ্টা করছে। মানুষের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা ঠিক। মানুষগুলো বড়ই বদ। নিজের প্রয়োজন থাকলে সহজে কাউকে ছাড়তে চায়না, প্রয়োজন ফুরালে ধরে রাখতে চায় না। সুন্দর নাক দিয়ে বের করে দেয়। নেমকহারাম জাত ! দুই নাম্বার বোতল খুললো শাহেদ। সেই চট্টগ্রামের কথা মনে আছেরে অমি। কি দারুন ছিলো হুইস্কিটা। নামটা মনে রাখলিনা, তাইলে ঢাকাতেও খুঁজে বের করতাম, গ্লাস ভরতে ভরতে বললো শাহেদ। কত কথাই ত আছে, কোনটার কথা বলছিস? বেনসনের নতুন প্যাকেট খুলতে খুলতে বললো অমি। সিগারেটের প্যাকেট খুলা অমির প্রিয় কাজগুলোর একটি। সবসময় সিগারেটের প্যাকেট খোলার কাজটা খুব আগ্রহ ভরে করে সে। অমি থাকতে শাহেদ সিগারেটের প্যাকেট খুললে অনর্থ হয়ে যাবে। সেই প্যাকেটের সিগারেটই খাবেনা সে। ঐ যে আমরা পতেঙ্গা থেকে দুই বোতল বার্মিজ হুইস্কি কিনে এনেছিলাম। গ্লাস এগিয়ে দিলো শাহেদ। হুম, মনে নেই আবার। বোতল দু’টি শেষ করে ন্যাংটো হয়ে রুম জুড়ে পাঁচ টাকার কয়েন খুঁজছিলি তুই, কিপটা কোথাকার! জাদুরকররা যেভাবে রশি ঘুড়িয়ে যাদু দেখায় অনেকটা সেই আদলে সিগারেটের প্যাকেটের মুখে লাগানো চিকন বন্ধনিটা খুলতে খুলতে বললো অমি। মোটেও ন্যাংটু ছিলাম না আমি, হাফপ্যান্ট পরা ছিলো। আর পাঁচ টাকার কয়েন না, পাচশ টাকার নোট। ঘটনাটার কথা মনে হলেই বিব্রত হয় শাহেদ। আবার এক কথা? হাফপ্যান্ট পাবি কই তুই? পরে ছিলি আন্ডারপ্যান্ট আর পাচশ টাকা না, পাঁচ টাকার কয়েন। অবশেষে বালিশের কাভারের ভীতর থেকে উদ্ধার হয় তা। তোর কপাল ভালো তখন স্মার্ট ফোন ছিলোনা, থাকলে ঐটার ভিডিও ইউ টিউবে ছাড়লে শাকিরার ভিডিওর চাইতে বেশি হিট পরতো। সিগারেটের প্যাকেট খুলে যত্ন করে একদম ডান কোনার সিগারেটটা বের করে বললো অমি।

– তোর আজকে কম খাওয়া উচিৎ। ভাবীর বাচ্চা হচ্ছে আর তুই এখানে বসে মদ খাচ্ছিস। খারাপ হচ্ছেনা ব্যাপারটা?

ফুরফুরে মেজাজটা হঠাত করেই খারাপ হয়ে গেলো অমির। এক দমে পুরো গ্লাসটা খালি করে নিজেই ভরে নিলো আরেক বার। সাধারনত গ্লাস ভরার কাজটা শাহেদই করে। অমি করে যখন তার নেশা ছুটে যেতে থাকে অথবা যখন প্রচন্ড মেজাজ খারাপ থাকে। শাহেদ চুপ করে আছে, কথাটা বলা ঠিক হয়নি। হাতে গ্লাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালো অমি। লাইট জ্বালালো রুমে। গিয়ে বসলো রুমের একমাত্র টেবিলটিতে। টেবিলটিতে ব্যাক্তিগত কাজ করে অমি। রুমটিও তার ব্যাক্তিগত। শাহেদ ছাড়া অফিস বা বাইরের অন্য কেউ কখনও ঢুকেনা এখানে। ড্রয়ার থেকে সেই কাগজটি বের করলো অমি। অমির পৃথিবীতে সবচাইতে মূল্যবান কাগজ।

নাম – মুনিয়া নীলা ।
বয়স-২৫ বছর।
মৃত্যু – ২৬ অগাস্ট, ২০১০।
মৃত্যুর সময়- সন্ধ্যা ৬টা।
মৃত্যুর কারন- সাফোকেটিং।

চার বছর আগের একটি কাগজে লেখা। নীলার ‘ডেথ সার্টিফিকেট’। আজ ২৬ এ সেপটেম্বর। ঠিক চার বছর ১ মাস আগের এই দিনে নীলা মারা গিয়েছিলো। হাসপাতালে হাসতে হাসতে একটা মানুষ মরে যায়! নীলার মুখটা যেনো কেমন ছিলো? ভালো করে ভাবার জন্য বাতিটা আবার নিভিয়ে দিলো অমি। ভাবার সময় বাতি থাকলে ভাবতে ভালো লাগেনা। এখন সে নীলাকে ভাববে। অমি কখনও নীলার কবরে যায়না। মাটিতে শুয়ে থাকা নীলার গলে যাওয়া দেহ নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। নীলার জন্য কোনো দোয়া পরেনা সে। দোয়া এখন তার কাছে অর্থহীন লাগে। দোয়া কি নীলাকে জীবিত করতে পারবে? না। তাহলে সেই অর্থহীন দোয়াতে কি লাভ? পরকালে সে কি নীলাকে পাবে? নিশ্চিত না। তাহলে সেই পরকালের কি দরকার তার? তার চাইতে বরং নীলার মৃত্যুর ঘোষনাটা পড়ে সে নীলাকে দেখতে পায়। নীলার বয়স এখনও ২৫, নীলা এখনও সন্ধ্যা ছয়টাতে হেসে চলছে। নীলপরীকে হারিয়ে দেয়া হাসি নীলার। জ্বলন্ত সিগারেটের আগুন আংগুলে এসে লাগাতে বাস্তবে ফিরলো অমি। জানিস নীলা মারা গেলো সন্ধ্যা ছয়টায় আর তন্বীও জন্মালোও একই সময়ে। তন্বীর বার্থ সার্টিফিকেটে লেখা আছে। কি মজার ব্যাপার, তাই না? শাহেদকে উদ্দেশ্য করে বলে চললো অমি, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি সেইদিন আমার কি করা উচিৎ। হাসপাতালে গিয়ে তন্বীর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি সুন্দর করে মেয়েটি অপলক চেয়ে ছিলো আমার দিকে। চোখে যেনো বিষ্ময় না, চোখে যেনো আদেশ। “দেখছ কি? আমি তোমার মেয়ে, আমাকে কোলে নিয়ে বারান্দা জুড়ে হাঁটো আর গান করো, আমি ঘুমাবো”, বলছিলো যেনো। আমি তাকে কোলে নেইনি। আমার তাকে কোলে নিতে ইচ্ছে হয়নি। সে আমার দিকে তাকিয়ে আদেশ দিয়ে চললো, “কোলে নাও, কোলে নাও এক্ষুনি। না হলে আমি তোমাকে বাবা ডাকবোনা।” কিন্তু আমি তাকে কোলে নেইনি। আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। মনে হচ্ছিলো সে বুঝে গিয়েছে আমি কেনো তাকে কোলে নিচ্ছিনা। আমি কাঁদতে পারছিলাম না জানিস শাহেদ। কীভাবে কাঁদি সবার সামনে? তন্বীর মা, তন্বীর মামা-মামী। এদের সামনে কীভাবে কাঁদি আমি? আমি হাসতেও পারছিলাম না। নীলা তখন হাসপাতালের মর্গে পরে আছে। আমি কীভাবে হাসি? তন্বী হয়ত সেইদিনের কথা মনে রেখেছে। সে কখনও নিজ থেকে আমার কোলে উঠতে আসেনি। আমি তাকে কোলে নিলে সে ভাবলেশহীন হয়ে থাকে। তন্বীর মাও তন্বীর জন্মের দিন আমাকে কিছু বলেনি। একবারও জানতে চায়নি আমি কেনো সেদিন তার পাশে ছিলাম না। সেই যে আমাদের বিয়ের রাতে মা স্ট্রোক করে মারা গেলো, এরপর থেকে তন্বীর মা আমার কাছে কিছুই দাবি করেনা। চুপ করে কাজ করে আর একা একা বসে বসে কি যেনো ভাবে, ভররাতেও দেখি বিছানায় শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে, ভাবছে কিছু । ভাবুকগে, আমার কি? মরন বিয়ে করেছি একটা। মায়ের আদেশে বিয়ে করলাম আর সেই মা-ই কিনা বিয়ের রাতেই পগারপার। একটা দিন আগে মরলেই ত বিয়েটা করা লাগেনা। মা গেলো, নীলা গেলো, পৃথিবীতে একমাত্র তুই ছাড়া আর কে আছে যার সাথে বসে বুকটা খুলে কথা বলতে পারি এমন। সেই তুইও যদি উপদেশ মারাস তাহলে তোকে কি করা উচিৎ বল। মোবাইল বেজে উঠলো আবার অমির। স্ক্রিনে লেখা “বাসা”।

– বাবা, আম্মু আপ্পিকে নিয়ে এসেছে। কি সুন্দর দেখতে আমার ছোট্ট আপিটে। একদম আমার মতো। এর সাথে শুধু আমি খেলবো, আর কেউ খেলতে পারবেনা।

– আম্মুকে ফোন দাও তন্বী মা।

– আম্মু ত এখন কথা বলতে পারবেনা। মুখোশ লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে ডাক্তার আংকেলরা। তুমি আসলে আমি তোমাকে আমার ছোট্ট আপিটার কাছে যেতে দেবোনা। তুমি পচা।

– আসছি মা আমি। তোমার আম্মু ভালো আছে ত?

– তোমাকে আসতে হবেনা। আসলে আমি তোমার গাল কামড়ে দেবো।

ফোন রেখে দিলো অমি । দ্বিতীয়বার বাবা হলো অমি। মনে হচ্ছে যেনো দ্বিতীয়বার নীলাকে হারালো সে। সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়। সময় নীলাকে নিয়ে যেতে পারছেনা কেনো? শাহেদ, আই এম দ্যা কিং অব দ্যা ওয়ার্ল্ড, আই এম দ্যা ফাদার অব টু গার্লস, লেটস হ্যাভ এ টোস্ট । তাচ্ছিল্যভরেই বললো যেনো অমি। গ্লাসটা আবার ভরতে উঠলো অমি। টাইলসে পা দিয়ে হালকা হোচট খেলো সে । হোচট খেয়ে পরে গেলো ফ্লোরের উপর। শরীরের নিচে আরেকটি শরীর টের পাচ্ছে অমি। মুখের সামনে কাত হয়ে পরে থাকা রাশিয়ান ভোদকার বোতল থেকে কড়া গন্ধ এসে নাকে লাগলো। নিজেকে সামলিয়ে ধীরেসুস্থে উঠে বসলো অমি। লাইট না জ্বালিয়েই আরেকটি ভোদকার বোতল খুললো । সিগারেটের প্যাকেটও ভাঙ্গল আরেকটা। শাহেদের শরীরে হাত দেবার প্রয়োজন বোধ করলোনা অমি, খুব ভালো করেই জানে সে শাহেদ বেঁচে নেই। শাহেদের মৃত্যুর সময় আর তার কন্যার জন্মের সময় যে এক এই ব্যাপারেও নিশ্চিত সে। ৭টার মতো বাজে হয়ত। অনেকদিন পরে নিশ্চিত প্রশান্ত মনে মদ খেতে পারছে অমি। তার জীবনের হিসেব এখন তার কাছে পরিষ্কার।

হাতে একটি কার্ড নিয়ে বসে আছে অমি। খুলছেনা, ইচ্ছে করেই। কার্ডের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু। ১৬ বছর পরে হাতে কাগজ ধরলো সে। মানসিক হাসপাতালের রোগীদের কাগজের কাজ নেই কোনো। তার উপর সে আবার সাজাপ্রাপ্ত আসামী। নিজের স্ত্রী আর কন্যাদের হত্যার চেষ্টাকারী হিসেবে প্রমানিত। উকিল আর ডাক্তাররা মিলে অনেক কষ্ট করে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে প্রমান করতে পেরেছে তাকে। নিজের মা, পরকীয়া প্রেমিকা আর বন্ধুর মৃত্যুর জন্য যে নিজের ঐ ছোট ফুটফুটে বাচ্চাদের আর বাচ্চার জন্মদাত্রীকে দায়ী করে তার মানসিক ভারসাম্য যে ঠিক নেই সেটি সব বিচারকরা অনুমান করতে পারলেও ঝুলিয়ে দেবার লোভ সামলাতে পারছিলেন না । অমির কেসটি মিডিয়াতে বেশ হইচই তৈরি করাতে হিউম্যান রাইটসওয়ালারাও তাই পেয়ে বসলো। যে অপরাধের মাত্রা বুঝেনা , অপরাধ বুঝেনা তাকে নাকি শাস্তি দেয়াটা ঠিক আইনসম্মত না। অনেক কিচ্ছাকাহিনীর পরে শেষে ঠাই হলো এই মেন্টাল হাসপাতালে। নিজের বিশ্বাসে অটল থাকাতে ডাক্তাররা ১৬ বছর ধরেই অমির নামের পাশে, “নট কিউরড” লিখে চলছেন নিয়মিতই। এখন আর দেখেও না তারা। মানসিক হাসপাতালের জরাজীর্ন রুমে হাতে একটি কার্ড নিয়ে বসে আছে অমি। বিয়ের কার্ড। উপরে লেখা, “আব্বু, তুমি আমার বিয়েতে আসবেনা_তন্বী”। গতসপ্তাহে কার্ডটি হাতে পেয়েছে অমি। ধরেনি সে। কি মনে করে যেনো আজ ধরলো কার্ডটি । হঠাত বুকের বা পাশটা কেনো যেনো চিনচিন করছে । বেশ অনেকক্ষন ধরেই ব্যাথা হচ্ছে, বেড়ে চলছে ক্রমশ। খাম থেকে কার্ডটি বের করলো অমি। মিউজিক বেজে উঠলো একটি। অনেকদিন পর মানুষের গলার শব্দের বাইরে অন্য কোনো শব্দ শুনলো অমি। ঠিক যেনো নীলার হাসির শব্দ। নীলা হাসলে এমন সুন্দর গান বেজে উঠতো। নীলার বয়স এখনও ২৫। মরে গেলে একটাই লাভ। বয়স বাড়ে না। নীলা তাই এখনও নীলপরীদের মতো হেসে চলছে। বুকের ব্যাথাটা আরো বেড়ে গেলো অমির। হালকা একটা শব্দ করে হাত থেকে কার্ডটি ফেলে দিলো সে। ধীরে ধীরে রুমের দরজার দিকে এগিয়ে চললো। কাউকে ডাকতে হবে। ব্যাথাটা ভালো ঠেকছেনা। হঠাত চোখ আটকে গেলো পরে থাকা কার্ডটির দিকে।

কনে- নূসরাত তন্বী।
বর- অর্ক হাসান।
বিয়ে – ২৬ এ অক্টোবর, ২০৩০।
রোজ- শুক্রবার।
সময়- সন্ধ্যা ৮ টা।

অমির মনে পরলো আজ শুক্রবার। দুপুরে ডাক্তার-বয়রা হল্লা করে নামাজ পড়তে গিয়েছিলো। দরজার উপরে ঝুলে থাকা ঘড়িতে তখন ৭ বেজে ৫৮ মিনিট। দরজার দিকে না এগিয়ে বিছানায় এসে বসলো অমি। মৃত্যুর সময়টা উপভোগ করতে চায় সে। সময় জেনে মরতে পারাটা অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: