Leave a comment

দেনমোহর একটি সামাজিক অন্যায়

যৌতুকশব্দটি শুনলেই কেমন জানি গা ঘিনঘিন একটা ভাব জন্ম নেয়। গ্রাম বা রিমোট জেলাশহরে যদিও এই সংস্কৃতিক এখনো জোরশেই বিদ্যমান তবুও যৌতুক নিয়ে একটা ভাবনা ঝড় উঠেছে এই কথা অস্বীকার করার জো নেই। “যৌতুক মানে ভিক্ষা” এই ধরনের চিকা এখন মফস্বল শহরের রাস্তাঘাটেও দেখা যায়।কিছুদিন আগে এক দোস্তের বিয়া হল। বেচারা যৌতুক নিয়ে এত বেশিই কনসাস একটু পরপর তার ফ্যামিলির লোকজনকে জিজ্ঞাসা করছিল যে,তারা কোন কিছু দাবি করেছে কিনা।বারবার জানতে চাওয়ায় তার পরিবারের লোকজন পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। এই সচেতনতা দেখে বেশ ভালো লাগল আমার কাছে। ভিন্ন চিত্র যে নেই সেটা বলছিনা,কিন্তু শিক্ষা হোক,নৈতিকতা হোক আর লোকলজ্জার ভয় হোক বিয়ের সময় যৌতুকের দাবি করাটা এখন শিক্ষিত সমাজে এমনকি মফস্বল গ্রামেও কমে আসছে। “গিফট” নাম দিয়ে পরোক্ষ যৌতুক যে নেয়া হচ্ছেনা সে কথা অস্বিকার করবোনা কিন্তু চিত্রটি ১৫ বছর আগেও ভিন্ন ছিলো। অন্তত আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা তাই বলে।

আসি মূল কথায়। যৌতুক কি?? বিয়ের সময় যদি পাত্রপক্ষ নিজে থেকে কোন অর্থ,গহনা,আসবাবপত্র থেকে শুরু করে যে কোনধরনের অর্থসংক্রান্ত দাবি দাওয়া পেশ করে তবেই তাকে যৌতুক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যদি সেই দাবিটি কনে পক্ষের স্বামর্থ্যের বাইরে হয় তবে তাকে “যৌতুকের মাধ্যমে নির্যাতন” হিসাবে গন্য করা হয়। এখন আসুন দেখি “দেনমোহর” কি??বিয়ের সময় একটি নির্দৃষ্ট অংকের টাকা নির্ধারন করা হয় যা পাত্র বিয়ের পর তার স্ত্রীকে দিতে বাধ্য থাকবে। অনেকে বলেন দেনমোহর হচ্ছে “স্ত্রীর অধিকার”। বর্তমানে যে শব্দটা সবচাইতে বেশি চলে তা হল,দেনমোহর স্ত্রীর “ভবিষ্যতের নির্ভরতা”।আরেকটু ঘুরায়ে বললে আমি এভাবেও বলতে পারি দেনমোহর হল “ডিভোর্সের সেফটি ইন্সুরেন্স পলিসি”। আচ্ছা এইসব সামাজিক সংজ্ঞা বাদ দিয়ে আসল সংজ্ঞায় আসি। যেহেতু “দেনমোহর” একটি ধর্মীয় টার্ম তাই ব্যাপারটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করলে একদম ফিলিফস বাতির মত ফকফকা হবে।

তুমি যখন তাকে মোহরানা দিলে তখন তার যোনি তোমার জন্য আইনসিদ্ধ হয়ে গেল।সুনান আবু দাউদ, বই ১১ হাদিস ২১২১

যোনি শব্দটা খিয়াল কইরা

সুরা নিসা আয়াত নম্বর ৪ (৪:৪)-এ:
আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশী মনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দে ভোগ কর।

ভোগ” শব্দটা খিয়াল কইরা

সুনান আবু দাউদ, বই ১১ হাদিস ২১২১:
মোহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে সওবান নবীর (দঃ) এক সাহাবি থেকে বর্ণনা করলেন: আলী নবীর (দঃ) কন্যা ফাতেমাকে বিবাহ করে তাঁর সাথে সহবাস করতে চাইলেন। আল্লাহ্‌র নবী (দঃ) আলীকে নিষেধ করলেন তাঁর কন্যার সাথে সহবাস করতে যতক্ষণ না আলী ফাতেমাকে কিছু দিয়ে দেন।

সহবাস” শব্দটা খিয়াল কইরা

চাইলে হাজার হাজার হাদিস,কোরানের রেয়াফারেন্স দেয়া যেত। কিন্তু বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই কাফি। এই দুটো হাদিস বা কোরানের আয়াত(মাফের প্রসংগে পরে আসছি) দিয়ে আমরা কি বুঝতে পারি??

দেনমোহর=গোপনাংগের মূল্য

এখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা কেন আসবে?? আজকাল অবশ্য অনেকে ব্যাপারটিকে এইভাবে দেখতে চাননা। কিন্তু আপনে চান কি চাননা সেটা ত বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হল ধর্মের বিধান

যেহেতু দেনমোহরের টাকাটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে তার শরীর ধরতে হবে তার মানে টাকাটা পকেটে নিয়েই আমাকে বিয়া করতে হবে। ধরুন আমি বিয়ে করার সময় বললাম ১০ লাখ টাকা মোহরানা দিব কিন্তু আমি মনে মনে জানি যে,আমি এই টাকা দিতে পারবোনা।এখন কি এটা মাফের পর্যায়ে থাকবে?মাফ পাব এই ধরে নিয়ে যদি আমি অন্যায় করি তবে সেটা মাফ পাওয়ার যোগ্য? আর স্ত্রী যদি লোকলজ্জার ভয়ে বা স্বামির স্বামর্থ নাই দেখে মাফ করে তবে কি সেটা মাফ হবে?? কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে যে, স্ত্রী ভালোবেসে মাফ করতে হবে। এখন স্ত্রী যদি ভালোবেসে মাফ না করে আর যদি মাফ না হয় তাহলে ত কেল্লা ফতে। আপনি স্ত্রীর গায়ে হাত দিলেন মানে ব্যাভিচার করলেন;বাইচান্স পুলা মাইয়া হয়ে গেলে সেগুলোর পরিচয় কি হবে?? বিয়ে ছাড়া বাচ্চা উৎপাদন ত ইসলামে নিষেধ দেয়া আছে।

বিয়ের সময় কনেকে শাড়ি গহনা কিনে দেয়া আমাদের সামাজিক নিয়ম। ধনীরা দেয় স্বর্ণ,গরিবেরা দেয় রৌপ্য। কিন্তু দিতে হবে এইটা ফাইনাল।স্বর্নের বাজারদর এখন কত বলতে পারিনা তবে লাস্ট আপডেট শুনেছিলাম ৫৫হাজার টাকা।আসেন এট্টু অংক করি। বিয়ের সময় মেয়ের গলারহার বাবদই লাগে ৪/৫ভরি স্বর্ন,সাথে অন্যান্য অর্নামেন্টস যোগ করে কম করেই ধরলাম ৮ভরি।

৮ভরি মানে ৮*৫৫,০০০=৪,৪০,০০০টাকা

দেনমোহর নূন্যতম ৫,০০,০০০ টাকা(যদিও ৫লাখ টাকার দেনমোহর আজকাল দেখিনা) ,

বিয়ের সময় অন্যান্য খরচ রাফলি ৫লাখ টাকা।

একুনে কুল মিলায়ে কত হল?? ১৫লাখ টাকা!!  আজকাল এই দূর্মুল্যের বাজারে ১৫লাখ টাকা পকেটে নিয়ে কারো পক্ষে “কবুল” বলা সম্ভব কি??কিন্তু এই টাকা ছাড়া কোন ছেলের পক্ষে কি বিয়া করা সম্ভব?? যদি সম্ভব না হয় তাহলে তাকে হয় ধার করতে হবে নতুবা পরিবারের সাহায্য নিতে হবে এবং বাসর রাতে ঘরে গিয়ে গদগদ ভাব করে নতুন বউকে বলতে হবে, “ওগো আমি দেনমোহর পরে দিয়ে দিব,আপাতত মাফি দাও”(সাবধান মাফ না চেয়ে গায়ে হাত দিবেন না কইলাম,তাইলে কিন্তু ব্যাভিচার হয়ে যাবে,বিয়া ভাইংগা যাবে)। এখন আমি যদি এটাকে পুরুষ নির্যাতন হিসাবে দাবি করি তবে কি খুব ভুল করব? যৌতুকের ব্যাপারে সচেতন মানুষের অভাব নাই,কিছুদিন আগে যৌতুক চাওয়ার জন্য মেয়ে নিজে বিয়ের আসর থেকে বিয়ে ভেংগে দেয়ার মত সাহসি খবরও পেয়েছি আমরা। স্যলুট তাকে।কিন্তু সবিনয়ে জানতে চাইছি আজ পর্যন্ত কোন মেয়ে সে যতই শিক্ষিত হোক কখনো কি বলেছে আমি ছেলের কাছ থেকে কোন গহনা নিবোনা, আমি দেনমোহর নিবোনা!!ব্যাপারটা বরং এইরকম হয়

দেনমোহর এবং গহনা যতটা না ধর্মীয় আর সামাজিক রিতী তারচাইতে বেশি সামাজিক স্ট্যাটাস। ১০লাখ টাকা দেনমোহর না দিলে পরিবারের নাক কাটা যায়,১০ভরির নিচে গোল্ড দিলে বা বিয়ের শাড়িটা ৫০হাজার টাকা না হলে মুখরক্ষা হয় না।কিন্তু এই দায়ভারটা বহন করতে হচ্ছে কাকে? আমি যদি সেটাকে নির্যাতন বলি তবে কি ভুল বলা হবে?বিয়ের পর যদি কারো ডিভোর্স হয় তখন দেনমোহর নিয়ে (যদি আগে দেয়া না থাকে)ছেলেটা কি ধরনের সমস্যার সামনে পরে সেটা কি বিবেচ্য না?আর দেনমোহর দেয়ার ভয়ে যদি কেউ বিয়ে ভাংতে না চায় তবে সেই বৈবাহিক জীবিন কি আদৌ মধুর হবে? ভেংগে যাওয়ার পর ঐ কয়টা টাকা কি একজন মেয়ের সারাজীবনের সিকিউরিটি দেবে? এখন পর্যন্ত দেনমোহরের জন্য কোন স্বামী স্ত্রীর হাতে মার খায়নি,গহনার জন্য কোন বিয়ে ভাংগেনি কথা সত্য; কিন্তু মাইর খাওয়ার আগ পর্যন্ত অন্যায় কে অন্যায় বলবোনা ??মানসিক নির্যাতন,অর্থনৈতিক চাপে রাখা কি অন্যায় নয়? কোন কারনে ডিভোর্স হলে ছেলেটিকে যে এই অন্যায় আব্দারের ঘানি টনতে হয় সেটা কি অন্যায় নয়? আশেপাশে কি এইরকম উদাহরন কম আছে?

আমি চাই যৌতুকের মত দেনমোহর নিয়েও একটা চিন্তার ঝড় উঠুক। ধর্মীয় বিধান মেনে যদি নিতেই হয় তবে সেটা এমন পর্যায়ে থাকুক যেন সেটা কারো উপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না করে। বিয়ে মানে দুটি মানুষের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া;আনন্দ দুঃখ সবকিছু ভাগ করা।ভালোবাসাকে কিছু টাকা দিয়ে ক্রয়বিক্রয়ের বাজারে তুলে দেয়াটাকে কি সভ্যতা বলে?

পোস্টের মূল লক্ষ্যঃ বিয়েকে না বলুন

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: