Leave a comment

দায়মুক্ত খুন

‘ঐ ভাগিনা কি তেহারি দিলি মাংসই ত নাই,মাংস দে আরো’ বলে প্লেটটা বাড়িয়ে দিলো পাবলু।দুই পিস মাংস আসলে ছিলো,সে দুইটা পিস মুখে দিয়েই আরো মাংসের দাবি জানাল । প্রথম প্লেটের পর এটি সেকেন্ড কোয়ার্টার তেহারি খাচ্ছে পাবলু। নীলক্ষেতের এই দোকানটার তেহারিটা ঢাকার শ্রেষ্ঠ। সেই ১৫টাকা দিয়ে খাওয়া শুরু করেছিল আর এখন ৪০টাকা। টাকা নিয়ে অবশ্য চিন্তিত না পাবলু। কারন সে টাকা দিবেনা। তার পকেটে আছে মাত্র ২০টাকা। অলরেডি সে ৮০টাকার তেহারি খেয়ে ফেলেছে। দুপুর টাইমে এই দোকানটায় মস্ত ভীড় থাকে।দোকানের ভীতর মাত্র তিনটা টেবিল।ঐখানে আর কতজন আটে। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খায় দোকানের আশেপাশে। লুংগি পরে বসে থাকা ম্যানেজার মহাশয় টাকা দিতে আর নিতে এতই ব্যাস্ত থাকে যে, এই ফাঁক গলে বিল না দিয়ে চলে যাওয়াটা খুব কঠিন কিছু না। বেশকিছুদিন প্র্যাক্টিস করে এই কায়দাটা রপ্ত করেছে পাবলু। টাইমিংটা পারফ্যাক্ট হলেই হলো। প্রতিদিন এই কাজ করেনা,বিশেষ দিনগুলোতেই করে।আজকে সেইরকম ‘বিশেষ দিন’।

তেহারি শেষ করে একটা গোল্ডলিফ ধরিয়ে নীলক্ষেত মোড়ে এসে চিন্তায় পরে গেলো পাবলু। আজকে কই যাবে? বুয়েটের দিকে যাবে নাকি ঢাকা ভার্সিটির দিকে? দুই দিন আগেই অবশ্য বুয়েট থেকে দুইটা মোবাইল চুরি করেছে সে। আজকে তাই ঐদিকে যাওয়াটা হয়ত ঠিক হবেনা। এক এলাকায় পরপর দুইবার চুরি করতে যাওয়াটা বোকামি। গতদিন বেশ দামি মোবাইল পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু বিক্রি করার টাইমে অত ভালো দাম পায়নি । দুইটা মিলে মাত্র ১০হাজার টাকা পেয়েছিল। ৭হাজার টাকা দিয়ে দিতে হলো চাংখারপুলের মিজান ভাইকে। সবই মালের টাকা। নেশার টাকা দিতে মন চায় না। কিন্তু না দিয়েও উপায় নাই। বলতে গেলে তাকে একরকম বাঁচিয়েই রেখেছে মিজান ভাই। দিনে কম করে হলেও তার ৪বার ইনজেকশন নিতে হয়। বাইরে থেকে কিনলে ১০০০টাকা চলে যাবে। মিজান ভাই একেবারে ২০০টা করে কিনে আনে। তার দিনে ১০/১২টা লাগে । বেচারার গায়ে কোনো ভেইন নাই। একমাত্র পাবলুই পারে তার গায়ে ছোট ছোট ভেইন বের করে সেখানে পুশ করে দিতে। পাবলুর এই গুনে মুগ্ধ হয়ে তাকে সহযোগী নিয়োগ করেছেন মিজান ভাই। টাকা থাকুক বা না থাকুক পাবলুর জন্য মাল রেডি থাকে। শর্ত দুইটা এক, মিজান ভাই যখন ডাকবে তখনই পাবলুকে এসে তার গায়ে পুশ করে দিতে হবে আর দুই, যখন টাকা পাবে তখন সেই টাকা তাকে দিয়ে দিতে হবে। টাকা ঠিকি দেয় কিন্তু অসময়ে ডাকলে ইচ্ছা করে শালাকে ৫বার গুতা দেয়ার জায়গায় ১০বার গুতা দিতে ভুলেনা পাবলু।

আজকে সকালে চাংখারপুলে মিজান ভাইয়ে বাসার কাছে যেতেই দেখে অনেক ভীড়। পুলিশ টুলিশ আসল নাকি? কিন্তু পুলিশ আসলে কান্নাকাটি করার কি আছে? ‘ঐ শফিক,কি হইছেরে?’ শফিকের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো পাবলু। ‘মিজান ভাই মইরা গেছে,রাইতেও ত দেখলাম এক্কেবারে ঠিক। দুপুর হওয়ার পরও যখন উঠেনা তখন খালাম্মা ডাকতে গিয়ে দেখে মইরা পইরা আছে।‘ খবরটা শুনে কেমন যেনো মিশ্র অনুভুতি হলো পাবলুর। মরেই গেলো? মরফিন নিয়া অবশ্য আজকাল পোলাপান গনহারে মরতেছে। কিন্তু তাই বলে এমনে মানুষ মইরা যায়? কোনো কথা নাই বার্তা নাই। এমনে ঠুস করে মইরা যায়? দুঃখ হচ্ছিলো কি না বুঝতে পারছিলোনা পাবলু। তবে আজকে সারাদিন কেমন চলবে সেটা ভাবে শংকিত হচ্ছিল। এখন সে কই যাবে? আগেরদিন একটি এ্যাম্পল চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল মিজান ভাইয়ের ড্রয়ার থেকে। ‘আগে পুশ করে শরীর ঠিক করি ,তারপর দেখা যাবে’।.এই জিনিসটা পুশ করেই সে তেহারি খেতে আসল। শরীরে মাল না ঢুকলে আবার কিছু খাওয়া যায় না। এখন ত আর মিজান ভাই নাই। আজকে তার টাকা লাগবেই। এই ভেবে নীলক্ষেত মোড় থেকে এফ রহমান হলের দিকে হাঁটা দিলো পাবলু…

****************************************

টিএসসির মোড়ে বেঁধে রাখা হয়েছে পাবলুকে। মোবাইল চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পরেছে সে। একপ্রস্থ মাইর দিয়ে এখন বেঁধে রাখ হয়েছে টিএসসির সড়ক দ্বীপে। এর আগে অবশ্য মাইর খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিলোনা পাবলুর। সে ত শখের চোর। নিয়মিত না। তার পকেট থেকে জগন্নাথ ভার্সিটির আইডি কার্ড পেয়েছে ছেলেরা। এই জন্যে হয়ত মাইর কম দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছাত্র হওয়ার সুবিধা দিচ্ছে নাকি ছাত্ররা? বুঝতে পারছেনা। প্রচন্ড পানির তেষ্টা পেয়েছে তার। ধুলো আর ঠোটফাটা রক্তের নোনতা স্বাদ লেগে আছে জিহ্বাতে। মাথাটাও ঝিম ঝিম করছে। কোন কুত্তারবাচ্চা যানি মাথাতে মেরেছে জোরে।

‘এই যে দুলাল ভাই, এই সে’ পাবলুর দিকে এগিয়ে আসা একটি ভীড়ের মধ্যমনিকে উদ্দেশ্য করে কেউ বলল কথাটি। ‘কিরে তুই? তুই জগন্নাথে পরছ?তাইলে জগন্নাথ রাইখা এইখানে চুরি করতে আহছ কেন?এখন চুপচাপ আমার ল্যাপটপটা কই আছে ক,গতকাল রাইতে চুরি কইরাই কি বেইচা দিছিস নাকি?’. কথাগুলো বলার সময় পাবলুর তলপেটে দু’টো লাত্থি মারল দুলাল ভাই। ‘ভাই, আমি কিছু জানিনা। আমি জীবনে প্রথম আইছি এইখানে। বিশ্বাস করেন ভাই আমি কিছু জানিনা’,আসলেই কিছু জানেনা পাবলু। জীবনে এইটা তার তৃতীয় চুরি। সে আর আগে জীবনেও আসে নাই এইখানে চুরি করতে। তাহলে কিসের ল্যাপটপের কথা বলে তারা? ‘ভালোয় ভালোয় কয়া ফালা কইলাম, পরে কইলা মাইরা ফালামু এক্কেবারে’দুলাল ভাইয়ের হুংকারের সাথে আশেপাশ থেকেও হুংকার আসে। কয়া ফালা কই দুলাল ভাইয়ের ল্যাপটপ। চিৎকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পাবলু। পারেনা।চিৎকার করার ক্ষমতাও ঠিক নেই এই মুহুর্তে। পেটে আর পিঠে সমানে মেরে চলছে ছেলেরা। নিজের চিৎকার নিজের কানেই যাচ্ছেনা আর তারা কি শুনবে? হঠাত কে যেনো বলে উঠল,দুলাল ভাই এইখানে মারলে সমস্যা হতে পারে,চলেন তারে রমনা পার্কে নিয়ে যাই।

প্রবল উৎসাহে তাকে পাজকোলা করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রমনা পার্কে। কয়েকজনের হাতে রড মনে হচ্ছে। ‘ভাই আমারে পুলিশে দেন ভাই,প্লিজ আমারে পুলিশে দেন ভাই’ কথাগুলো আনমনে বলেই যাচ্ছিল পাবলু , কারো কানে যাচ্ছিলো কি না সেটা নিয়ে অবশ্য তার যথেষ্ট সন্দেহ ছিলো। হঠাত কে যেনো রড দিয়ে মাথার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বারি দিল। ‘কুত্তার বাচ্চা ,তুই আমাগো দুলাল ভাইয়ের ল্যাপটপ চুরি করছিস? ছাত্রনেতার ল্যাপটপে হাত দেয়ার কলিজা কেমনে হইল তোর খানকির পোলা,সময় আছে এখনো কইয়া ফালা কই আছে ল্যাপটপ’।. আওয়াজ কোনদিক থেকে আসছিল বলতে পারবেনা পাবলু। তার চোখ বুজে গেছে রক্তে। হাত বাঁধা। রক্ত সরানোর কোনো উপায় নেই। ‘আমি জানিনা ভাই,সত্যই আমি জানিনা,আমারে পুলিশে দেন ভাই,আমারে পুলিশে দেন ভাই’।. রক্তে ভেজা ঠোট দিয়ে কোনমতে কথাগুলো বলল পাবলু। “পুলিশে দিমু তোরে বাইঞ্চুদ?আমরা থাকতে পুলিশ লাগবো কেন চুরের বাচ্চা। আমরাই তোর বিচার করমু’,তাইলে তুই কবিইনা কই আছে ল্যাপটপ?’ বলে মাথার পিছন দিকে আরেকটা রডের বারি পরল। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে পাবলুর। অসহ্য যন্ত্রনা মাথা থেকে শরীরের প্রতিটি অংগে ছড়িয়ে যাচ্ছে নাকি? ওহ না!! সারা গায়েই রডের বারি পরছে। একটা সময় কেমন যেনো অনুভুতিশুন্য মনে হচ্ছে সবকিছু। কোথায় সে? সে কি মারা যাচ্ছে? তানহার কথা মনে আসছে কেনো ? তানহার ত বিয়ে হয়ে গেছে।তানহা কি আছে এখানে?তানহার হাতেও কি একটি রড আছে? তার মৃত মাথাটা কি তানহা একবার তার কোলে রাখবে?তানহা ত রক্ত ভয় পায়,তানহা কি তার রক্তাক্ত ঠোটে একটা চুমু দিবে?? একবার…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: