Leave a comment

জাত্যাভিমান

‘অঞ্চলপ্রীতি’,’দেশপ্রেম’,’জাতীয়তাবাদ’,’ধর্মীয় মূল্যবোধ’…শব্দগুলো শুধুই শব্দ নয়।মানুষকে গোষ্ঠিবদ্ধ করতে এই শব্দগুলো ভীষন জরুরী। অচেনা শহরে আমি যখন আমার এলাকার কোনো মানুষ দেখি তখন একটি ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে যায় মনে।শরীরের কোষগুলো টের পায়, আমার কাছের কেউ একজন সামনে এসেছে। হয়ত এলাকাতে আমি তার সাথে জীবনেও কথা বলিনি কিন্তু এই অচেনা শহরে তাকেই মনে হবে আমার আপনজন।একই কান্ড আরো বড় স্কেলে হবে দেশের বাইরে। আম্রিকার সাদা চামড়াওয়ালা বলেন আর সৌদিয়ারবের পাক্কা মুমিনই বলেন কেউ আপনাকে সেই শান্তি,নির্ভরতার পরশ দিতে পারবেনা যেটা একজন কুৎসিত(তাদের চোখে) বাংগালী দিতে পারবে। মানুষ পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান প্রানী। যেহেতু তার বুদ্ধি বেশি তাই তার চাহিদা বেশি আর যেহেতু তার চাহিদা বেশি তাই তার চিন্তাও বেশি ,ভয়ও বেশি। এই ভয় থেকেই মানুষ সেই আদিম সমাজ থেকেই গোষ্ঠিবদ্ধ জীবন যাপন করে আসছে। কালে কালে তা পরিবর্তিত হয়ে জাতিসত্তার আকার নিয়েছে। এরপর আসলো রাষ্ট্রের ধারনা। মাঝে আবার ধর্মও ঢুকে গেলো। ধর্ম,দেশ,জাতি কোনটি আগে? এই নিয়ে বাকযুদ্ধ,রাস্তার যুদ্ধ চলে আসছে অনেকদিন ধরেই। তবে মানুষকে গোষ্ঠিবদ্ধ রাখতে যে ধর্ম ব্যার্থ এর সবচাইতে বড় প্রমান ‘৪৭ এ শুধুমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যার্থতা। ধর্ম শুধুই একটি আচার, তা রাষ্ট্রের ফাউন্ডেশন দিতে বা ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তাকে এক করতে ব্যার্থ। কেনো?

গতকাল আমার বান্ধবির সাথে আমার ঝগড়া হচ্ছিলে একটি ব্যাপার নিয়ে(নিয়মিতই হয়,নতুন কিছুনা) ।. ঝগড়ার কারনটি এইরুপ, আমি বলছিলাম ,আমাদের বাসাতে ইফতারি করার সময় টেবিলের মাঝখানে সকল আইটেম রাখা হয় যে যার ইচ্ছামত সেখান থেকে নিয়ে খায়। আলাদা করে কাউকে প্লেট দেয়া হয় না। সে বলছে তার বাসাতে তারা খুব আয়োজন করে খাবার সাজায় প্লেটে প্লেটে। ঝগড়ার কারন ছিলো বিয়ের পর আমরা কোন সিস্টেম ফলো করবো? আমার কথা হচ্ছে, আমার মা যদি এই সিস্টেমে রদ না চায় তাহলে কি আর করা,তুমি প্লেটে নিয়ে খাবা আর আমরা প্লেট ছাড়া খাব। তার কথা হচ্ছে সে পাল্টাবেই। শেষ পর্যন্ত কি হলো সেটি বলার দরকার আছে কি? মেয়েরা কখনো ঝগড়াতে হেরেছে শুনেছেন? আমাদের দুইজনের পারিবারিক কালচার ভিন্ন। প্রতিটি জাতির এমন ভিন্ন ভিন্ন কালচার থাকে।যে জাতি যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, যে জাতি যেভাবে তার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়েছে সেটিই সে জাতির “সংস্কৃতি”।. কালে কালে সেই সংস্কৃতির বীজ আমাদের রক্তে প্রোথিত হয়ে যায়। সংস্কৃতির গন্ধ শুকে আমরা আপনজন চিনে লই। মানুষের সৃজনশীলতার বিকাশ,বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের পিছনেও এই জাতিগত সংস্কৃতি বড় নিয়ামক। তাই একটি জাতিকে তার নিজের মতো বেড়ে উঠাতে বাঁধা দেয়া মানে একটি সম্ভাবনাকে মেরে ফেলা। হয়ত সেই গাছ আমাদের ছায়া দিতে পারত,হয়ত সেই গাছ আমাদের আরোগ্য লাভের ওষুধ দিতে পারত। কে জানে? আমরা ত গাছটাকে বাড়তেই দিলাম না।

কলজে যখন পড়তাম তখন এক রুমমেট ছিল চাকমা। সে ছিলো ভীষন সাস্থ্যসচেতন। একদমে ১০০টা বুকডন দিতে পারতো। বিকালে স্পোর্স্টের সময় পুরা কলেজ চষে ফেলত দৌড়িয়ে। ধরুন রাতের বেলা ঘুম ভেংগে গিয়েছে তখন সে বলত “ঘুম যখন ভেংগেই গেলো তাহলে১০টা বুকডন দিয়া ফালাই”।. আমরা হাসাহাসি করতাম তার কান্ড নিয়ে। কিন্তু সাস্থ্যগতভাবে তাদের উন্নতি দেখে হিংসাও করতাম। ব্যায়াম করাটা আসলে তাদের সংস্কৃতির অংশ। এ গেলো চাকমাদের কথা। আমরা তাদের ডাকতাম “উপজাতি” বলে।মানে যারা এখনো ঠিক জাতি হয়ে উঠতে পারেনি আর কি। এখন অবশ্য আমাদের দেশের সরকার দয়া করে আর তাদের উপজাতি বলেনা এখন সংবিধানে তাদের যে পরিচয় আছে সেটি অনেকটা এইরকম “ক্ষুদ্র জাতিসত্তা”, “নৃ-গোষ্ঠি”। না, তাদের আলাদা স্বাধীন জাতি বলা যাবেনা। তাদেরকে বাংগালী বানাতে হবে। ’৭১ এ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর যখন আমরা সবাই স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলাম তখন বেরসিক ঐ উপজাতিগুলার প্রতিনিধি যারা আমাদের যুদ্ধে আমাদেরই সারথী ছিলো তারাও স্বাধীনভাবে বাঁচার দাবি জানায়। কত বড় সাহস তাদের? আমরাও কি কম যাই নাকি? বঙ্গবন্ধু সাফ বলে দেন, “তোরা সবাই বাঙ্গালি হইয়া যা।” এখানে মানবেন্দ্র লারমার উত্তরটিও দিয়ে দেয়া দরকার মনে করছি, “আমি চাকমা। আমি বাঙ্গালি নই। আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক, বাংলাদেশী। আপনারাও বাংলাদেশী, তবে জাতি হিসাবে আপনারা বাঙ্গালি। আদিবাসীরা কখনো বাঙ্গালি হতে পারেনা।”

আদিবাসী কারা? এ নিয়ে বেশকিছু আলোচনা চলছে। যারা ব্যাপারটিকে জাস্ট ‘আদিবাসি’ শব্দটি দিয়ে যাচাই করতে চাচ্ছেন তারা হয়ত ভেবে নিবেন আদিবাসী মানে যাদের আদি নিবাস এখানে। কথাটা সত্য তবে আংশিক। জাতিসংঘ আদিবাসীদে যে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে তাতে একদল হচ্ছে যাদের আদি নিবাসকে আরেকদল জোর করে অধিকার করে নিয়েছে। যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের আদি বাসিন্দারা যাদেরকে বহিরাগত শ্বেতাঙ্গরা হত্যা করে এসব ভূ-খন্ডে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।আবার আরেকদল হচ্ছে “যে সব ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনগোষ্ঠীর অন্য অংশ থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন পদ্ধতির কোন পরিবর্তন ঘটেনি।” এখানেই আসে বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রশ্ন। বাংলাদেশে ৪৫টি আদিবাসী বা সংখ্যালঘু জাতিসত্তার অধিবাসী বাস করে, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।এদেরকে আদিবাসী কেনো বলবো? কারন এদের ভাষা থেকে শুরু করে সামাজিক,সাংস্কৃতিক আচারা আচরন সবই বৃহত জনগোষ্ঠি(বাংগালি) দের থেকে আলাদা।

আদিবাসীদের নিয়ে জাতিসংঘের এত মাথা ব্যাথা কেনোদূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সর্বদাই হয়েছে,হচ্ছে,হবে। কিন্তু আমরা যেহতু নিজেদের সভ্য দাবি করি আবার আরেকদিক দিয়ে নিজেরাই আরেক সভ্যতাকে ভেংগে দিতে তৎপর হই তাই আমাদের মধ্য থেকেই কাউকে না কাউকে সভ্যতার মাপকাঠি ঠিক করে বিলুপ্ত সভ্যতাগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়। সেই উদ্যোগটাই জাতিসংঘ নিয়েছে। রাফ হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ৭০টি দেশে ৩৭ কোটিরও বেশি আদিবাসী আছে যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতি সে দেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা। ইউনেস্কোর হিসেবে বর্তমানে পৃথিবীতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন। পাশের বড় বড় জাতিগুলোর জাত্যাভিমান,অর্থনৈতিক আগ্রাসনে এই জাতিগুলো তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে শংকিত।একবার নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ইন্ডিয়ার জাতিগত আক্রমন কি আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছেনা? আমরা কি সেটার প্রতিবাদ করছিনা? তাহলে একজন চাকমা যখন তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে চায়,তার জাতিগত সংস্কৃতিকে,ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে বাঁচতে চায় তখন আমরা কেনো তার বিরোধিতা করব? যে বাংগালী জাতি পাকিস্তান জাত্যাভিমানের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে ৯মাসে ৩০লাখ মানুষ আত্মাহুতি দিলো সেই বাংগালীই ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার’ ঘোষণায় ভোট দেয় না(মাত্র ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে আর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এরা বিপক্ষে ভোট দেয়)।.ইতিহাস থেকে তাহলে আমরা কি অত্যাচারী হবার দীক্ষাই নিলাম? আমরা আজ জাতিসংঘে গিয়ে বলি আমাদের দেশে কোনো আদিবাসী নেই,তারমানে যেগুলো ভিন্ন জাতির লোক আছে সেগুলোকে আমরা বাঙ্গালী বানিয়ে ছাড়ব।

আমরা কিভাবে তাদের অত্যাচার করছি? আমরা তাদের দেইনি আলাদা জাতির মর্যাদা। সংবিধান মতে তারা বাংগালীদের মাঝেই একটি উপজাত মাত্র। যদিও শান্তি চুক্তি করেছি আমরা তাদের সাথে কিন্তু আমরা তার প্রায় কিছুই বাস্তবায়িত করিনি। মেজর জিয়া সমতল থেকে মানুষ নিয়ে গিয়ে তাদের জমি জামা দখল করে যে অবিশ্বাসের সূচনা করেছিলেন,তাদের উপর আর্মি লেলিয়ে দিয়ে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল যা এরপর থেমে থাকেনি বরং বেড়েছে তার উপর শান্তির প্রলেপ কি একটা কাগুজে চুক্তিতে সম্ভব?বরং আমরা উলটো দিনাজপুর থেকে সাওতাল জনগোষ্ঠি নির্মুল করেছি, খনিজ তোলার জন্য, সম্পদ রক্ষা করতে মেয়ে অলিফ্লে ও সরেনের মত নাম না জানা অনেক আদিবাসীকে জীবন দিতে হয়েছে৷ আজও আদিবাসীদের নেই তাদের নিজের ভাষার পাঠ্যপুস্তক,আমরা আমাদের বাংলা ভাষার বই চাপিয়ে দিচ্ছি তাদের উপর ফলতঃ আদিবাসীর বিরাট অংশ অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে৷ ভার্সিটি আর চাকরিতে দুটো কোটা দিয়েই আমরা দায় সেরে ফেলছি। কিন্তু ভিন্ন ভাষাতে শিক্ষা নিয়ে তারা কিভাবে আসবে প্রতিযোগিতা করতে সেটা ভাবছিনা। এখনো পাহাড়ে পাহাড়ে নির্যাতিত হচ্ছে আদিবাসীরা , এখনো আমরা তাদের “জাত” না ভেবে “উপজাত” ভেবে যাচ্ছি। এখনো তারা আমাদের কাছে নিম্নবর্নের মানুষ হিসাবে চিহ্নত হচ্ছে। সুযোগ পেয়ে আমরা আজকে তাদের সবাইকে আমাদের পোষ মানা পশুতে রুপান্তরিত করতে চাচ্ছি অথচ ভুলে যাচ্ছি একসময় আমরা নিজেরাই নির্যাতিত ছিলাম।

গতকাল আদিবাসী দিবস ছিলো। দিনাজপুর সহ অনেক জায়গায় তাদেরকে দিবস পালন করতে দেয়া হয় নি। শুনলাম আগস্ট শোকের মাস। তাই এই মাসে আদিবাসী দিবস পালনের নামে আনন্দ যজ্ঞ করাটা ঠিক না। তাহলে এই মাসের ঈদটা আমরা পরের মাসে করি? পারলে খালেদা জিয়ার কেক কাটা থামায়ে দেন দেখি ১৫তারিখে। আবার দিপু মনি বলেন, তাদের আদিবাসীর মর্যাদা দিলে নাকি আমাদের সার্ভমৌত্ব হুমকির মুখে পরবে। নিজের অত্যাচারী মুখটা ঢেকে রাখার জন্য যুগ যুগ ধরে এমন কথা সবাই বলে গিয়েছেন। একবার ধর্ম আর আরেকবার সার্বভৌমত্বের মুলো দেখেছি আমরা।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা অনেক বিবেকবান মানুষের সাহায্য পেয়েছি। ইন্ডিয়া থেকে আমেরিকার অনেক মানুষও আমাদের পাশে এসে দাড়িয়েছিলো। সারা পৃথিবী জুড়ে তারা পাকিস্তানী অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। আমাদের জন্য রাস্তায় নেমেছে। অল্প হওক,বেশি হওক আমাদের তারা সাহায্য করে গিয়েছে। তারা ভুলে গিয়েছিলো তাদের রাষ্ট্রিক পরিচয়,ধর্মপরিচয়। একজন নির্যাতিত নারীর কোনো ধর্ম থাকেনা, রাষ্ট্র থাকেনা। থাকে মানবতা। আমরা কি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে যোগ দিবো এই হিংস্রতায় নাকি আমরাও মানবিক হব? মানবতা আমদের যা দিয়েছে তার প্রতিদান কি আমরা অমানবিকভাবেই দিয়ে যাব?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: