Leave a comment

গোলামি দিবসের দাবি জানাই

কিছুদিন আগে সিলেট থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে। সিলেটের ট্রেনে AC কম্পার্টমেন্ট মানে যে কেবিন তা জানা ছিলোনা। এক হ্যাপি ফ্যামিলির সাথে বসে বসে আসতে হয়েছিল । ২বাচ্চা ,মা,বাবা,দাদা কি অত্যাচারটাই না করল।পুরা রাস্তাই তারা খেয়ে গেল। মহিলারা কোথাও গেলে সাথে করে দোকানপাট যে কেন নিয়ে যায় আল্লাহ মালুম!! বাচ্চা আর মায়ের কনভার্সেশন আমি বুঝতে পারছিলাম না। কিয়তকাল পর বুঝলাম তারা হিন্দিতে বাতচিত করছে!! ক্যাবলে আজকাল পোগো নামে একটা হিন্দি কার্টুন চ্যানেল আছে , কার্টুন নেটয়ার্ক চ্যানেলটিতেও মনে হয় এখন হিন্দিতে কনভার্ট করে কার্টুন দেখায়। বাচ্চারা কার্টুনের সাথে সাথে এই ভাষা রপ্ত করছে। এর সাথে সাথে হিন্দি/ইন্ডিয়ান কালচারও কি ঢুকে যাচ্ছেনা তাদের মাঝে? রামায়ন-মহাভারত নিয়ে এখন নিয়মিত কার্টুন হচ্ছে ইন্ডিয়াতে । সেদিন আর বেশি দূরে নেই যেদিন বাচ্চারা সুপার হিরো বলতে আর সুপারম্যান,স্পাইডারম্যান কে চিনবেনা; হুনুমান,রাম এদেরকেই সুপার হিরো জ্ঞ্যান করবে।

আমার বাসার টিভিতে যে ক্যাবল সংযোগ আছে তাতে ৬০টা চ্যানেল দেখা যায়।এই লেখাটি লেখার জন্য আজকে চ্যানেলগুলো আবার একটু ভালোভাবে অবজার্ভ করলাম। ৬৫টির মাঝে ১৫ টি বাংলা, ৩টি লোকাল চ্যানেল(যেগুলোতে সর্বদাই হিন্দি মুভি,গান,কলকাতার মুভি দেখায়), ৫টি কলকাতার বাংলা,৩টি ইংলিশ নিউজ চ্যানেল, ৭টি খেলার আর বাকিসব হিন্দি।এমনকি শিক্ষামূলক চ্যানেলগুলোও হয় বাংলা নয় হিন্দি। এর মাঝে হিন্দি কার্টুন চ্যানেলও আছে ২/৩টি। আমার বাসাতেও সন্ধ্যার পর আমার মা আর ভাবী মিলে শুরু করে দেয় জিবাংলার সিরিয়াল দেখা , সাত পাকে বাধা সিরিয়ালের রাজা মারা যাওয়াতে আমার মা আর ভাবীর দুঃখের শেষ নাই। আমার ভাতিজাটাকে সেদিন দেখি ধিনকা চিকা ধিনকা চিকা বলে চেচাচ্ছে।

হিন্দি চ্যানেল/কলকাতার বাংলা চ্যানেল দেখাতে সমস্যাটা শুধু সাংস্কৃতিক না। ইন্ডিয়া যে আমাদের চ্যানেলগুলা ইন্ডিয়াতে প্রদর্শনের অনুমতি দেয় না সেকি শুধু আমাদের মানসম্মত(!) অনুষ্ঠানের ভয়ে? মোটেও তা না। আপনি যখন কোন চ্যানেল দেখেন তখন সেখানে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনগুলোও দেখেন। ঐদিন বাবা মাকে তুলে দিতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। ভাবী বলল চিপস এনে দিতে । ভাইয়া কড়া করে বলে দিল যেন lays এর চিপস আনি। lays আর potato chips এর মাঝে পার্থক্য কোথায় , মানে? অবশ্যই না। বিলাসদ্রব্য বা অপ্রোয়জনীয় সামগ্রীর ক্ষেত্রে মার্কেটিং পলিসি এবং প্রচারটাই মুখ্য, দ্রব্যের গুন না তারকাদের ইমেজই এইসকল দ্রব্যের চাহিদার মূল কারণ ।লাক্স মেখে কেউ ঐশ্বরিয়া রায় এর মত সুন্দরী হয় না বা কসকো মেখে কেউ অসুন্দর হয়ে যায়না। সাবানের মেকানিজম একই। পুরাটাই ফাঁকি। lays এর এড করেন সাইফ আলী খান আর potato chips এর এড করে দেশি পুলাপান।তাই আমরা যখন সাইফ/শাহরুখ/দিপিকা পাড়ুকানের এড করা সামগ্রী কিনি তখন মনে মনে নিজেদের ওদের লেভেলে কল্পনা করি। তাই আমরা ১৫টাকা দিয়ে দেশি চিপস না কিনে ৭০টাকা দিয়ে lays কিনি, কোমরে ব্যাথা হলে Move, চকলেট কিনলে center fresh ,আঠা কিনলে Fevicol মোটোরসাইকেল কিনলে Hero,bajaj কিনে সুখি হই। এইগুলা হচ্ছে ইন্ডিয়ান চ্যানেলের বাইপ্রোডাক্ট। আর সেইজন্যেই ইন্ডিয়ান সরকার আমদের চ্যানেলের অনুমোদন দেয়না। আমাদের অনেক প্রোডাক্ট ইন্ডিয়ান মার্কেটে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই এই রেস্ট্রিকশন।

ডেইলি স্টারে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আমরা বছরে ২০০০ কোটি টাকা ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলো দেখার জন্য ব্যায় করি মানে এই টাকা আমরা ইন্ডিয়ার পকেটে পাঠাই এর সাথে যোগ করুন আমদের ক্রয়কৃত ইন্ডিয়ান দ্রব্যাদি যা আমরা ঐ চ্যানেলগুলো না দেখলে কিনতাম না। যে পরিমান টাকার ইন্ডিয়ান সামগ্রী আমরা কিনি তার বদলে যদি দেশী সামগ্রী কিনতাম তাহলে ঐ টাকা দেশে থাকত,ইন্ডাস্ট্রিগুলো আর স্ট্রং হত অর্থাৎ আমরা একে ত ইন্ডিয়াতে টাকা পাঠাচ্ছি এর সাথে সাথে দেশীয় দ্রব্যগুলোর পাছা মেরে দিচ্ছি।

কোন প্রবাসি দেশে আসা মাত্রই নিজেকে ভিনদেশি হিসাবে পরিচয় দিতে অস্থির হয়ে যায়। তাকে নিয়ে একটা আলু কিনতে গেলেও বলবে “বিদেশের আলু কত ভালো, এইডা কোন আলু হইল?” বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিচ কক্সবাজারে নিয়ে গেলেও বলবে, “এইডা কোন বিচ আর এইডা কোন সাগর সাগর ত দেখছি আম্রিকাতে,ইন্ডিয়াতে”।আমার এক বন্ধু কুয়েত থাকে , তার ইদানিং হাইপ্রেশার ধরা পরেছে। সে কথায় কথায় বলে কুয়েত গেলে প্রেশার থাকেনা,দেশে আসলে হয়!!মানে কি দেশের বাতাসে প্রেশার বেড়ে যায়? আমরাও ছাগলের মত তাদের সেই অমৃত বানী শুনি আর সহমত পোষন করি। আরেক বেটার মা যদি খুব বড়লোক আর পয়সাওয়ালা হয় তবে মনে হয় আমরা নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে আফসোস করি। এখন আমাদের হাল এমন হয়ে গেছে।নিজের গোলাম পরিচয়টা দিয়ে আমরা যে স্বাদ পাই তার তুলনা বিড়ল না অদ্বিতীয়।তাই আমি ফেব্রুয়ারি মাসের একটা দিনকে “গোলামি দিবস” ঘোষনা করার দাবি জানাচ্ছি। ফেব্রুয়ারিই পারফেক্ট মাস এই গোলামি দিবসের জন্য। ভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছেন তাদের ঋণ তখনই শোধ হবে।

সেদিন দেখলাম সংগিত শিল্পি মিলার এক সাক্ষাৎকারে তিনি অনর্গল হিন্দি বলে যাচ্ছেন, হৃদয় খানের একটা গান শুনলাম কয়েকদিন আগে যেখানে দুই তৃতিয়াংশ গানটিই হিন্দিতে গাওয়া। পরিবর্তনের হাওয়া কি টের পাচ্ছেন?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: