Leave a comment

গতি ও চিঠি

প্রাইমারি স্কুলে যখন পড়ি তখন প্রতিদিন টিফিন বাবদ বরাদ্দ থাকত ২টাকা।টিফিন বরাদ্দ বললে সত্যের অপলাপ হবে কারন আমার মা টিফিনের ব্যাপারে অতিরিক্ত সচেতন ছিলেন। বাড়ি থেকেই কিছু না কিছু রেঁধে দিতেন। প্রায় সময়ই মেন্যুতে থাকত পোলাও আর মুরগির মাংস। কোনো এক রহস্যময় কারনে আমার মায়ের তখন “পোলাও” বস্তুটির প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ছিলো। বড় ভাইয়ারা ভার্সিটি থেকে বাড়িতে এসেছে…পোলাও রান্না হবে;বড় ভাইয়ারা চলে যাবে যেদিন সেদিনও পোলাও রান্না হবে। আরেকটি বস্তু ছিলো “দুধের নাড়ু”।. পাশের এক হিন্দু মহিলাকে দিয়ে অর্ডার দিয়ে দিয়ে বানিয়ে আনতেন আম্মা। এই বস্তুর প্রতি আমাদের চার ভাইয়ের অপিরসীম লোভ। এখনো বানান আম্মা। এখন আমেরিকা-কানাডা নিয়ে যান এই দুধের নাড়ু। যা দিয়ে শুরু করেছিলাম। দুই টাকা। টিফিনের দু’টি টাকা তখন ছিলো যক্ষের ধন। দুই টাকা করে জমিয়ে তখন ডাকটিকেট কিনতাম। কত দেশের কত ডাকটিকেট! অন্যের ডাকটিকেট চুরি করাও ছিলো বিরাট আনন্দের ব্যাপার।এই ব্যাপারে আমদের একখান দলও ছিলো। বোকাসোকা ছেলেদের এলবাম খালি করে ফেলতাম দলবেধে চুরি করে। এখন কিন্তু চুরি করিনা, আল্লাহর কিরা! আরো কিনতাম নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড- পোস্টার,ম্যাকগাইভারের পোস্টার বা খেলোয়াড়দের পোস্টার,স্টিকার।ডাকটিকেট আর ভিউকার্ড কিন্তু শুধু কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না।কেনাকাটার চাইতে বেশি অদল-বদল হতো। যেমন আমার কাছে হয়ত মাধুরি দিক্ষীতের ভিউকার্ড নাই,শ্রীদেবির অনেকগুলা আছে কিন্তু আরেকজনের কাছে শ্রীদেবীর নাই, মাধুরিরি আছে। তাহলে আমরা এক্সচেঞ্জ করে নিতাম। প্রাচীন আমলের বস্তুর অদল-বদল প্রথার মতো আর কি!

প্রাইমারি স্কুলের পর গেলাম বড়দের স্কুলে। ডাকটিকেট,ভিউকার্ড কেনার শখটি কিভাবে জানি ধুম করে মরে গেলো। একদিন কোনো এক বন্ধুর কুপরামর্শে(!) যে প্রাইমারি স্কুলে ৫বছর পড়েছি সেই প্রাইমারি স্কুলেরই পাশের এক লাইব্রেরিতে গেলাম। এর আগে বই পড়ার তেমন আগ্রহ ছিলোনা।বাসায় যদিও বেশ বড় একটা বুকশেলফ ভরা বই ছিলো বড় ভাইদের কল্যানে কিন্তু সেদিকে আমার বিন্দুমাত্র লোভ ছিলোনা। পড়াশোনা বলতে গেলে গোপাল ভাড়ের জোক আর নন্টে-ফন্টে,চাচা চৌধুরি,বাটুল দি গ্রেট,হাদা-ভোদা এইসকল কমিক্স। যাই হওক সেই লাইব্রেরিতে গিয়ে প্রথম কয়েকদিন ছবিযুক্ত বই খুঁজে খুঁজে পড়লাম। কোনো একদিন হয়ত আমার হাতে এসে পড়ল হুমায়ুন আহমেদের “বোতল ভুত” বইটি। বিকাল বেলা পড়া শুরু করে বাড়িতে আসতে আসতে সন্ধ্যা করে ফেলেছিলাম। সন্ধ্যার আগে বাসায় না আসার অপরাধে বেশ ভালো পরিমানেই উত্তম-মধ্যম গিয়েছিলো শরীরের উপর দিয়ে। এরপর পেয়ে বসল বইয়ের নেশা। টিফিনের টাকা তখন ২ থেকে ৫ এ উন্নীত হয়েছে। এখনো মনে আছে টিফিনের টাকা জমিয়ে কেনা প্রথম বই “আমার আছে জল” এর কথা। ৪০টাকা , কমিশন নিয়ে ৩২টাকা দাম এসেছিলো বইটির।মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে কেনা বইগুলোর কিছু এখনো আমার সেই সুদিনের সাক্ষ্য দিচ্ছে বুকশেলফে। প্রাইমারি স্কুলের ডাকটিকেট আর পোস্টারের নেশা তাই হাইস্কুলের এসে বই কেনা আর নিত্যনতুন ডিজাইনের চিঠি লেখার প্যাডে এসে আসন গাঁড়ে। প্যাড কেনো??চলুন বলি।

সেইসময় স্কুল জীবনের সবচাইতে বিরক্তিকর এবং দুঃখের ব্যাপার ছিলো বন্ধু বিরহ। আমার কপাল ছিলো এইদিক অতীব খারাপ(এখনো খারাপই আছে)।. ধরা যাক কোনো ছেলের সাথে আমার সেইরকম বন্ধুত্ব হয়ে গেলো এরকিছুদিন পরেই সেই বন্ধু স্কুল ছেড়ে চলে যাবে বলে ঘোষনা দিলো। কি কারন? তার পিতা বদলী হয়ে গিয়েছেন অন্যকোনো শহরে। আমার পিতাও সরকারি চাকুরীজীবি ছিলেন। কিন্তু আমার জন্মের আগেই “পরিবার নিয়ে বদলী” হবার সংস্কৃতি তিনি ত্যাগ করেছিলেন। বদলী হলে শুধু তিনিই স্থান পরিবর্তন করতেন কিন্তু আমরা না। তাই বদলী হয়ে চলে যাবার বেদনা আমাকে ভোগ করতে হতোনা। বদলী হয়ে বন্ধুরা যখন চলে যেতো তখন অবশ্যই তারা তাদের নতুন আস্তানার ঠিকানা দিয়ে যেতো অথবা আমার ঠিকানা নিয়ে যেতো। বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে অশ্রুভরা চোখে একটি কথাই বলত সবার শেষে, “চিঠি দিস”।. আমি কথা রাখতাম। প্রতিদিন আমি চিঠি লিখতাম। এক বন্ধুকে একাধিক চিঠিও লিখে ফেলতাম কোনো কোনোদিন। আমার ড্রয়ার ভরে যেতো চিঠিতে চিঠিতে। কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারনে আমি সেই চিঠিগুলোর বেশিরভাগই পোস্ট করতাম না। চিঠি লিখার সময় বুকের ভিতর যে আবেগ এসে ভিড় করত পরেরদিন যখন পোস্ট করতে যাব তখন মনে হতো এটা ছেলেমানুষি আবেগ। এই আবেগ দেখাতে নাই। কিন্তু সেই চিঠিগুলো আমি বারবার পড়তাম,বারবাবার পড়তাম। আমার মনে হতো আমি যেনো সেই বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। আমার চিঠিটাই শত মাইল দূরের বন্ধুটিকে কাছে নিয়ে এসেছে। খুব আয়োজন করে চিঠি লিখতাম আমি। দুই তিন কালারের কলম নিয়ে বসতাম। কখনো কখনো উপন্যাস,কবতিরা বইও থাকত পাশে…ভাষাগত জটিলতা থেকে আমাকে মুক্ত করার জন্য। কিন্তু রাতে লেখা চিঠিটাই আবার সকালে কেমন যেনো “ঠিক হলোনা” টাইপ অনুভুতি নিয়ে আসত। ঠিক করে আবার লিখতাম পরদিন…আবার পরদিন…আবার…।।. কিন্তু সেই চিঠি আর ঠিক হয়নি কোনোদিন। আমার সেই বন্ধুরাও আর কেউ আমার জীবনে নেই।

কলেজে ভর্তি হলাম। বাড়ি ছেড়ে ঢাকা গেলাম। পড়েছি রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে। সেই কলেজ ছিলো আধা সিভিল-আধা ক্যাডেট। হলে (তারা অবশ্য হাউজ বলে) উঠে জীবন তামা তামা। একদিকে সিনিয়ার(ক্লাসে না, কলেজে ভর্তির দিক দিয়ে) দের অত্যাচার আর আরেকদিক দিয়ে রুটিন মেনে চলা জীবন। কত স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম ঢাকাতে…ঘুরব, সিনেমা দেখব, মেয়েদের সাথে টাংকি মারব,প্রেম করব আর এখন হাফপ্যান্ট পরে পিটি করছি! এইটা কিছু হইল?প্রথম বছরটি কেটেছিলো জেলের কয়েদিদের মতো করে। সেকেন্ড ইয়ারে অবশ্য আমি নিজেই শেয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম। বাংলা ব্যাকরনের বই মাঝখান দিয়ে কেটে সেখানে সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রাখতাম আর স্যার এসে খুজতে খুঁজতে হয়রান। যাই হওক, প্রথম বর্ষে সেই জেল জীবনে মৃদু হাওয়ার পরশ নিয়ে আসত একটি চিঠি। আম্মার চিঠি,আব্বার চিঠি,বন্ধুদের চিঠি। ডাকপিয়ন হলে আসলে হা করে তাকিয়ে থাকতাম অফিস রুম থেকে ডাক আসে কিনা সেই প্রতীক্ষায়। খাইষ্টা স্যারগুলা আমদের চিঠি আগে নিজেরা পড়ে নিতো এরপর আমাদের দিতো। ক্যাডেটের নিয়ম নাকি এইটা! যাই হওক, আমার ত আর প্রেমপত্র আসতেছেনা,তাই আমার মাইন্ড খাওয়ার কিছু ছিলোনা। যখন নজরুল ভাই এসে রুমে ডাক দিতো “চিঠি আইছে” বলে তখন মনে হতো চিঠি না চিঠির সাথে চিঠি লেখকও এসে গিয়েছে।বাড়ির চিঠি যখন খুলতাম তখন মনে হতো চিঠির সাথে আমার বাড়ির উঠোনের একটুকরা গন্ধও বুঝি চলে এসেছে। বন্ধুদের চিঠির সাথে সেই বন্ধুর বুক থেকে ছিঁড়ে আসা ভালোবাসাটাও অনুভব করতাম । একটি চিঠি বারবার পড়তাম। অনেকসময় চিঠি নিয়ে ঘুমাতে যেতাম। এক চিঠির উত্তর দশবার লেখতাম। তারপর সেখান থেকে বেছে বেছে সেরাটা হয়ত পোস্ট করতাম। যতবার চিঠি লিখতাম ততবার মনে হত আমি তার সাথে কথা বলছি। আমি আম্মার সাথে কথা বলছি, রনির সাথে কথা বলছি।

আগামী মাসে আমার বড় ভাই আসবে আমেরিকা থেকে। পুরা বাসা তাই নতুন করে সেটাপ হচ্ছে। রঙ করা হচ্ছে, আশেপাশের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার হচ্ছে। সাদা চামড়াওয়ালাদের পরিচ্ছন্ন দেশে জন্মানো আমার ভাতিজা দুইটা হয়ত এইদেশের নোংরা পরিবেশ সহ্য করতে পারবেনা! তাই আগাম ব্যবস্থাগ্রহন। সেই পরিষ্কার পরিচ্ছনতা অভিযানের ফলস্বরূপ আজকে বের হলো অনেকগুলো চিঠি। আমার যেই ভাইটি আগামী মাসে আসছে সে ১৫ বছর আগে যখন আমেরিকা গিয়েছিলো তখনকার চিঠি। মাসে একটা চিঠি আসত তার। আমরা সবাই আয়োজন করে পড়তাম সেই চিঠি। সবার জন্য আলাদা আলাদা চিঠি থাকত। যদি কোনো কারনে কারো জন্যে চিঠি না থাকত তাহলে ……বলার দরকার আছে?পেলাম তারও আগের চিঠি। আমার মেঝো ভাই ছিলো একটু উদাসিন টাইপ। “টাকা চাহিয়া পত্র” ছাড়া সেই সাধারনত চিঠি দিতোনা। তাই সিলেট ম্যাডিকেল কলেজ থেকে যদি কোনো চিঠি আসত তাহলে আমি ফাইজলামী করে আম্মাকে জিজ্ঞাস করতাম, “কত টাকা আম্মা?” আম্মা খেপে যেতো। টাকা চাহিয়া সেই চিঠিও পেলাম দুই একটা।পেলাম আমার কলেজের চিঠি,ভাইয়াদের কলেজ-ভার্সিটির চিঠি। এখন কেউ চিঠি লেখেনা। লেখার প্রয়োজনও নাই। ইমেইল আছে, আছে ফেসবুক। এই সবেরই বা দরকার কি? আছে মোবাইল। চিঠি তাই এখন অর্থহীন। একটি চিঠি দিয়ে যে তথ্য দেয়া দরকার সেই তথ্য আমরা এখন অনেক সহজেই দিতে পারছি হয়ত। কিন্তু তথ্যের মাঝে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা,চোখের পানিগুলো কি দিতে পারছি? চিঠির সাথে মিশে থাকা প্রেমিকার গায়ের গন্ধ কি ফেসবুক মেসেজে আসে? প্রেমিকার চিঠিটির গায়ে দেয়া একটি চুমুকে প্রতিস্থাপন করার ক্ষমতা কি এককোটি (:*) সিম্বলটির আছে?আমরা এখন হয়ত খুব দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করি কিন্তু আবেগগুলো রয়ে যায়। তড়িত-চুম্বকিয় শক্তির সাধ্য নেই আবেগের গতি বাড়ানোর।জমে থাকা আবেগগুলো তাই হয়ত মারাই যাচ্ছে। অতিদ্রুত তৈরি হওয়া আমাদের সম্পর্কগুলোও তাই দ্রুতই ভেংগে পরছে। শিল্প বিপ্লব মানুষকে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলো, টেকনোলজির বিপ্লব কি মানুষকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন করে দিবে? কি জানি?

আমার জনম স্বার্থক কারন আমি দুই প্রজন্মের সন্ধিক্ষনে জন্মেছি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: