Leave a comment

ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদ্রাসা মিডিয়াম…

বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর সদ্যবিকশিত লেজ আর লম্বা হয়ে যাওয়া হস্ত দুইটার খরচ মেইনটেইন করার জন্য টিউশনির দরকার ছিল। এক বন্ধু জুটিয়ে দিল এক ছাত্র, ইংলিশ মিডিয়ামের ৮ম শ্রেনী(মতান্তরে standard 8:P)। লালবাগ বাসা, হেটেই চলে যাওয়া যাবে। প্রথম দিন গিয়ে দেখি ছাত্রের শেলফ এ রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প সংকলন। ভাবলাম, আমারা হুদাই ইংলিশ মিডিয়ামের পোলাপানের সমালোচনা করি। ৮ম শ্রেনীর ছাত্রের শেলফ এ স্বয়ং কবিগুরু! আমিই ত এত আগে কবিগুরুর পায়ের ধুলো নিই নাই। মুগ্ধতা কেটে গেল কিছুক্ষনের মাঝেই , যখন জানতে পারলাম যে তা আসলে পাঠ্যসূচিতে কবিগুরুর একটি গল্প আছে বলে কেনা(১টি গল্পের জন্য পুরা সমগ্র!! বড় লোকের বড় কাড়বার!!)। কিছু সময়ের মাঝে কেটে যাওয়া মুগ্ধতাটা হতাশাতে পরিনত হল যখন দেখলাম গ্রেডশিটে বাংলার পাশে খালি ‘D’ এর সমাহার, কিয়তকাল পরে তা ক্ষোভে পরিণত হল, যখন ছাত্র বলল যে, ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রই নাকি বাংলায় ফেল করে এবং তার চোখের অভিব্যাক্তি বলে দিচ্ছিল যে, এই ফেল করাটা একটা গর্বের ব্যাপার!! বুঝলাম এতদিন আসলেই ভুল জেনে এসেছি, ওরা ত আসেলে বাংগালী গোত্রের মাঝেই পরেনা(জেনারেলাইজ করে ফেললাম, দুঃখিত।কারন আমি ঐ অপ্ত বাক্যে বিশ্বাসি “exception is not example”) . অল্প পরিশ্রমে বেশি পয়সা উপার্জনের লোভে এরপর আরো অনেক ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র ছাত্রী পড়িয়েছি আর পদে পদে টাস্কি খেয়েছি এরা কোন শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে , এরা কোন সংস্কৃতি বুকে ধারন করছে?

একজন মানুষের চিন্তা, চেতনা, রুচি, পছন্দ, পরিমিতিবোধ… বড় স্কেলে দেখলে রাজনৈতিক বিশ্বাস, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমও অনেকাংশে শিক্ষা,সংগ,পরিবেশ এই ৩টি ব্যাপারের উপর নির্ভরশীল।স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে আমরা যা শিখি তার চাইতে বেশি শিখি স্কুলের পরিবেশের কাছ থেকে,শিক্ষকদের কাছ থেকে যা শিখি তার চাইতে অনেক বেশি শিখি বন্ধুদের কাছ থেকে।এই লেখাটা যারা পড়ছেন, তদের মাঝে কয়জনের মাদ্রাসা পাস /ইংলিশ মিডিয়াম পাস বন্ধু আছে?অনেকেরি নাই বা থাকলেও বলার মত না।কিন্তু সবারি এমন অনেক বন্ধু আছে যারা অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, তারপরো বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে তা বাধা হয়নি কারন আহরিত শিক্ষা সেক্ষেত্রে কোন বাধা হয়ে যায়নি।কি ভয়ানক একটা কথা বললাম আমি, “শিক্ষা বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াল?” কিন্তু এই কথা অস্বীকার করার কোন উপায় কি আছে?? ব্যাপারটা শুধু বন্ধুত্বে আটকে থাকলে কোন প্রব্লেম ছিলোনা।২/৪টা বন্ধু কম থাকলে কিছু হয়না। কিন্তু ঐ শিক্ষা তাদেরকে মানসিক ভাবে ভিন্নধারার মানুষ হিসাবে গড়ে তুলছে।হিসাবে মাদ্রাস কিংবা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র কিন্তু এখন কম নয়। মাদ্রাস্রার ছাত্রের পরিমানে তেমন কম বেশি না হলেও ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে । এরা কিছুদিনের মাঝেই সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে যাবে।ফলাফল কি হবে তা সমাজবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন, কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তার তা শুভ হবেনা।

ইংলিশ মিডিয়াম বা মাদ্রসা শিক্ষার পিছনের কারনটা মোটামুটি সবারি জানা। এই নিয়া আর প্যাচাল পারার মানে নাই। নিজের পরকালের রাস্তা পরিস্কার আর ছেলেক সঠিক দ্বিনী শিক্ষা দেওয়ার জন্যই মাদ্রাসায় ভর্তি করেন বেশিরভাগ মানুষ। অর্থনৈতিক ব্যাপারটাও এইখানে ধর্তব্য, কারন শহরে আমরা মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র কম পাই অথচ জেলাশহর বা গ্রামে প্রচুর দেখা যায়। মুদ্রার ঠিক উল্টা পিঠেই ইংলিশ মিডিয়াম বিরাজমান। ইংলিশ মিডিয়ামের পড়ানোর পিছনে স্ট্যাটাস বৃদ্ধি,আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে ইংলিশ এর ভালো দখল , সর্বোপরি সামাজিক ভাবে এগিয়া থাকার চেষ্টাই মূল। এইখানে সবচাইতে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হল শিক্ষার আসল গুরুত্বটাই এখানে গৌন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষা একজনকে তার সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়,তাকে তার ইতিহাস সম্বন্ধে সচেতন করে, মূল্যবোধ জাগ্রত করে , জ্ঞ্যান বিজ্ঞ্যানের আধুনিক শাখাগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করায়। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়াম বলুন আর মাদ্রাসা বলুন এই দুই শিক্ষাব্যববস্থা কি আসলেই এই প্রয়োজনগুলো মিটাতে পারছে ??

মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে বলতে পারবোনা কিন্তু ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি যতগুলো ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র ছাত্রী পড়িয়েছি তাদের কারোরি Math & Science এর ব্যাসিক মোটেও ভাল না।BUET, DU, MEDICAL সহ বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের অনুপস্থিতি আমার কথার পক্ষে যুক্তি হতে পারে। ভিন্ন ভাষাতে পড়াই কি এর আসল কারন কি না তা আমি বলতে পারবোনা, কিন্তু একটা কারন হতে পারে আমার ধারনা।

ইংলিশ মিডিয়াম বা মাদ্রাসা শিক্ষার সবচাইতে বড় সমস্যা সাংস্কৃতিক। ইংলিশ মিডিয়ামের কারিকুলাম সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না। তারা যে ইতিহাস পড়ে তা বাংলাদেশের ইতিহাস না। তারা পড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বীরত্বের ইতিহাস আর আমরা পড়ি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তাড়ানোর ইতিহাস, আমরা প্রতি ক্লাসে মুক্তিযুদ্ধকে জানি আর ওরা সামাজিক বিজ্ঞানে অল্প করে জানে , না জানলেও চলে।কিছু কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে নাকি বাংলা বলাও নিষেধ। তার মানে মানসিক বিকাশটাও যেন ইংলিশে হয় সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একি ব্যাপার প্রযোজ্য।যদিও তাদের কারিকুলাম নিয়ে আমার স্পষ্ট কোন আইডিয়া নেই, কিন্তু তারা আমদের কৃষ্টি কালচার ইতিহাস জেনে বড় হয়না সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।ইদানিং আরেকটা ব্যাপার বেশ ভালোভাবেই চোখে পরছে তা হল ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রদের অতিরিক্ত ধর্মপ্রিতী। ব্যাক্তিগত জীবনে ধর্মের প্র্যাক্টিস খুব একটা না থাকলেও সুযোগ পেলেই খৎনা করা শিশ্নটাকে দেখানো টা তারা জিহাদি দায়িত্ব জ্ঞ্যান করে।মেয়েদের পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে আলোচনা করা এবং সুযোগ পেলেই সেটা নিয়ে কাউকে হেনস্তা করতে পারলে হেনস্তা করার সুযোগ তারা ছারেনা। আজকাল ফেসবুক এর বিভিন্ন পেজ , ব্লগে এই ধরনের ঘটনা নিয়মিতিই ঘটছে। এর পিছনে একটা বিরাট অংশ যে ইংলিশ মিডিয়াম থেকে আগত তা আমি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। ধর্মীয় বিশ্বাস জন্ম থেকেই সবার ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তিতে আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজস্ব যুক্তি, বিদ্যা আর জ্ঞ্যান দিয়ে তা পালন করে থাকি।ধর্মিয় জ্ঞ্যানের স্বল্পতা ও নিজস্ব যুক্তি , বিদ্যা আর জ্ঞ্যানের অভাবেই ঐ ইংলিশ মিডিয়াম পাসকৃত ছাত্রেরা এই আচরন করে থাকে , আমার বিশ্বাস(যুক্তিভিত্তিক বিশ্বাস)।

আর দশটা ভাষার মত ইনরেজী শুধুই একটি ভাষা। যদিও আমাদের রাষ্ট্রিয় প্রেক্ষাপটে এই ভাষাটার গুরুত্ব অনেক, কিন্তু তাই বলে একটি ভাষা ভালো করে জানার জন্য পুরা শিক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাটা হাস্যকরের সাথে সাথে অবৈজ্ঞানিকও বটে। ঠিক একিভাবে ধর্ম একটি সামাজিক বিধান, শুধু ওর জন্য একটি শিক্ষাব্যাবস্থা তৈরি করাটাও ঠিক বৈজ্ঞানিক না। ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর PHD করেও মাদ্রাসা পাস ছাত্রের চাইতে অনেক বেশি ধর্ম জানা যায়, বস্তুত তারাই ধর্মকে ভালোভাবে জানে এবং তারা আরো ভালোভাবে সবার সাথে কমিউনিকেট করতে পারে।

কিছুদিন আগেও একমুখি শিক্ষা নিয়ে অনেক প্যাচাল হল। প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিলাম আমি। এখনো কোন আশার আলো দেখিনা আমি। জানি বাংলাদেশে কোন ভালো উদ্যোগ খুব তাড়াতাড়ি মাঠে গড়ায়না। আর যেখানে হুজুর আর ধনীক শ্রেনীর অনীহা আছে সেখানে এই উদ্যোগ ফলপ্রসু হবে আমি তা বিশ্বাস করতে পারিনা। তারপরো আমি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, একদিন হবে কোন একদিন হবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: