Leave a comment

আইসক্রিম

-বিরানি ত দেহি গান্দা হইয়া গ্যাছে ,ডলা দিওনের আগেই গইল্যা যায়।

-সকাল থাইক্কা বেচতাছি, কেউ ত কইলোনা গান্দা হইছে,তোমার কুত্তার নাক নাহি?

-আমার নাক কুত্তার না,যারা খাইছে হেগো কুত্তার পেট। আর নাইলে জীবনেও বিরানি খাইছেনা হেরা,এইটা বিরানি হইলো কোনো?

-হ,বিরানি ত খালি তুমিই খাইছো,তিনবেলাই খাও বিরানি। তাইলে এইহানে আইছো কিল্লাইগা? বাড়িত গিয়া বউরে কইলেই ত বিরানি রাইন্দা দেয়। ২৫টেকার বিরানি খাইবো তার আবার গান্দা,আগান্দা।

মেজাজ চড়ে গেলো সুফিয়ার।সকাল থেকে ফুটপাতে গরম খাবারের ডেকচি নিয়ে বসে থাকা আরামের কাজ না মোটেও। এমনিতেই জুলাই মাসের তীব্র গরম। সূর্য সেই কখন মাথার উপরে উঠেছে আর নামার নাম নাই। বেহায়া প্রেমিকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে দেখেই যাচ্ছে ঢাকা শহরকে। রমনার গাছগুলোর মাঝেও ‘পুলিশ’ ‘পুলিশ’ ভাব। দিনের বেলা প্রেমিক যুগলদের ‘আক্রমণাত্মক ভালোবাসা’ ,নেশাখোরদের কিছুটা নিরাপত্তার আশ্রয় আর রাতের বেলা টাকার বিনিময়ে পাতানো ‘সাময়িক সংসার’কে আড়াল করতে করতে গাছগুলোর মাঝেও রক্ষাকর্তা ভাব চলে এসেছে। বাতাস ছাড়ার নাম নেই,ঠায় দাঁড়িয়ে মানুষের সিদ্ধ হওয়া উপভোগ করে ট্রাফিক পুলিশের মতো। দ্রুত কয়েকটা গাড়ি চলে গেলো সুফিয়ার সামনে দিয়ে। একটিকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে আনা হয়েছে শাহবাগের ফুলের দোকান থেকে। বাতাস আর সূর্যকে পরোয়া করার প্রয়োজন নেই এই এ্যায়ার কন্ডিশনড গাড়িগুলোর। আজ শুক্রবার। রাস্তায় ভীড় নেই তেমন। শুক্রবার হচ্ছে ঢাকার “বিয়ে দিবস”। শাহবাগের ফুলের দাম সেইদিন কয়েকগুন বেড়ে যায়। গাড়ি,বাসরঘর সাজিয়ে দেবার লোকদের কদর বাড়ে। সুফিয়ার জন্য অবশ্য দিনটা তেমন ভালো না। অন্যদিনের চাইতে শুক্রবারে কাস্টমার কম থাকে।রাস্তা ফাঁকা থাকায় এইদিন অনেক রিক্সাওয়ালাই নিজের বাসায় যায় দুপুরে খেতে। ভিক্ষুকদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন আজ। শুক্রবারে মৃত বাপ-মায়ের ‘মৃত্যু উৎসব’ পালন করে অনেকেই । বড়লোকদের ড্রাইভার,অফিসের কর্মচারিরা এসে ফকিরদের দাওয়াত করে নিয়ে যায়। শুক্রবারে তাই ভিক্ষুকদের ঝাঁজ বেড়ে যায়। সারা মাস সুফিয়ার খোলা হোটেলের বাসি বিরানি,মোটা চালের ভাত,আটার রুটির সাথে লংকা ভর্তা,বাজারের পচা মাছ কিংবা নানা উপায়ে সংগ্রহ করা মরা মুরগির সাথে লাল টকটকে ঝোল অমৃতের মতো করে খেলেও শুক্রবারে “তোর দোকানে মানুষ খায়” ভাব নিয়ে হেঁটে যায় দোকানের সামনে দিয়ে। প্রথম প্রথম রাগ করতো সুফিয়া। দুই একটা কথা শুনিয়েও দিতো পরদিন খেতে আসলে। কিন্তু কিছু কাস্টমার পাশের দোকানে চলে যাওয়ার পর থেকে আর কথা শোনায় না সুফিয়া। পুরো সপ্তাহ ভিক্ষা করে খেতে আসা মানুষগুলোকে একদিন সাহেবদের আচরন করতে দেখে এখন বরং মজাই পায় সে। এছাড়া কাস্টমারের সাথে ব্যবহার ঠিক রাখতে হয়,না হলে কাস্টমার অন্য ভাতের টং এ চলে যাবে। ঢাকা শহরে এখন টং এর অভাব নেই,কাস্টমারের অভাব। তারপরও বিরানি খেতে বসা এই কাস্টমারের সাথে তেজ দেখিয়েই কথা বলতে লাগল সুফিয়া। মাত্রই দুইজন বিরানি খাওয়ার জন্য প্লেট ধুয়ে বসেছিলো আর তখনই ‘বিরানি গান্দা’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। এরকম অভিযোগ শুনে কি আর কেউ খেতে চাইবে বিরানি?

-বউ এর হাতের বিরানি খাইতে পারলে কি আর তোমার দোকানে আহি খাইতে?

-তাইলে যারা খাইয়া গেলো তারা কেউ গান্দা কইলোনা,তুমি গান্দা কও ক্যামনে? সক্কাল থাইকা ২০ প্লেট বেচলাম। সবাই মজা কইরা খাইলো,কথা কইলোনা কোনো আর তোমার কাছে গন্দ লাগে? কই দেহি এইদিকে আনো, ক্যামন গান্দা দেহি আমি।

গন্ধ হয়ে যাওয়া বাসি বিরানি নাকের কাছে নেবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলোনা সুফিয়ার। মূল উদ্দেশ্য বাকি দুই কাস্টমারকে বিরানি খেতে প্ররোচিত করা। এখনও তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। একবার যদি গলার জোরে প্রমান করে দেয়া যায় যে বিরানিতে গন্ধ যেটি আছে সেটি স্বাভাবিক তাহলেই আরো দু’প্লেট বিক্রি হয়ে যাবে। আজকের বিরানিটা অন্যদিনের অর্ধেক দামে কিনেছে সুফিয়া। মোস্তাফিজ তাকে রোজ বিরানি দিয়ে যায়। মোস্তাফিজ থাকে পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকায় যতগুলো বাসা ততগুলো বিরানির দোকান। উৎসবেরও কমতি নেই সেখানে। ছেলের মুসলমানিতে ৭দিন ধরে মানুষ না খাওয়ালে তাদের মেহেমানদারির সমালোচনা হয়। পোলাও-বিরানি-তেহারির তাই অভাব হয়না সুফিয়ার। মোস্তাফিজ ভালো দামেই দেয় তাকে। তবে মোস্তাফিজ ব্যাটা আজ তাকে ঠকিয়েছে। সকাল বেলা বিরানির হাঁড়ি থেকে এক লোকমা মুখে নিয়েই বুঝেছিলো নষ্ট নষ্ট ভাব আছে।কিন্তু মোস্তাফিজ বললো, ‘আরে ভাবী আমি আপনারে নষ্ট মাল দিমু নাকি?এতদিনের ব্যবসা তাও যদি এমন করেন তাইলে দিলে দুঃখ লাগে ভাবী। আপনের যখন সন্দেহ লাগতাছে তাইলে যান, আজকে আধা দাম দ্যান।পরে লাভ হইলে পুষায়ে দিয়েন।” লোভে পরে কিনে নিলো সুফিয়া। লোভের ফল হাতেনাতেই পাচ্ছে। এমনিতেই নষ্ট বিরানি তার উপর আজকে শুক্রবার। অন্যদিন হলে সকাল সকাল বেশ কয়েক প্লেট বিরানি চলে যায় কিন্তু আজকে কাস্টমারই নেই সকাল বেলা, তা বিরনি যাবে কিভাবে? ৫জন খেতে নিয়ে সবাই একই অভিযোগ করলো,’গান্দা হয়ে গেছে’। এখন এই পুরা ডেকচি বিরানি সে কী করবে বুঝতে পারছেনা। গরমে বিরানি আরো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে … না ভাবতে চাইছেনা সুফিয়া। নিদেনপক্ষে যে টাকা খরচ হয়েছে সেটি তুলতে পারলেও অন্তত লস হতো না তার। আজ এমনিতেই ব্যবসা মন্দা তার উপর এই উপরি লোকসান টা কোনোমতেই সহ্য করতে পারছেনা সুফিয়া, কল্পনাতেও না।

-নেও, শুইংগা দেহ তোমার বিরানি গান্দা নাকি বালা। প্লেটটি বাড়িয়ে দিলো কাস্টমার।

হাত বাড়িয়ে প্লেটটা নিলো সুফিয়া । নাকের কাছে প্লেটটা নিয়ে বেশ কসরত করে মুখের অভিব্যাক্তিতে পেটগুলানো ভাবটা প্রকাশ করলোনা সে। গন্ধে তার বমি বমি ভাব আসছে কিন্তু সেটিকে বিরানির বিশেষত্ব বলে প্রমান করতে হবে তার। আড়চোখে একবার দেখে নিলো নতুন দুই কাস্টমারের চেহারার রঙ। বেশ উৎসাহ নিয়ে দেখছে তারা। ছেলেগুলো রিক্সা ড্রাইভার না। কাপড়-চোপড়ে দিনমজুর বলেও মনে হচ্ছেনা তাদের। তাহলে বাকি থাকে ঠ্যাকবাজ। আশেপাশের এলাকার অনেক ছিনতাইকারি,ছোটখাট চোর,পকেটমার সুফিয়ার দোকানে আসে খেতে। পয়সা হাতে পরলে এরা নবাবপুরের স্টার হোটেলে যায় আর না হলে চাংখারপুলের নীরব হোটেলে। এখানে যেদিন খেতে আসে সেইদিন ঐ হোটেলগুলোর গল্প করে। বুঝিয়ে দিতে চায়, ‘আমরা রোজ এখানে আসিনা,আমরা বড় হোটেলে খাই। আজকে নেহায়েত ইচ্ছা করছেনা স্টারে যেতে তাই তোমার দোকানে আসলাম।’ এমন ভাব মারে হারামজাদাগুলা। একটা ছেলেকে নাকি সেইদিন গুলিস্তানে মানুষ পিটায়ে মেরে ফেলেছে। দোকানে আসা দুইজন যুবক গল্প করছিলো,সেখান থেকেই জানলো সুফিয়া। কী দরকার বাপ এগুলো করার? শরীরে বল আছে,কামাই করে খা। মানুষের টাকার দিকে লোভ করার কি দরকার? টাকার লোভ অনেক বড় লোভ। আর সবচাইতে বড় লোভ হইলো “সস্তা টাকা”। যে লোভে পরেছে আজকে সুফিয়া স্বয়ং। অর্ধেক দামে বিরানি কিনে কি বিপদটাতেই না পরল সে। ছেলে দুটির মুখ দেখে ঠিক ঠাহর করতে পারছেনা সে। তারা কি সুফিয়ার অভিনয়ে বোকা বনেছে? একবার খালি অর্ডার নিয়ে প্লেটে দিতে পারলেই হলো, এক লোকমা খেলেও আর ফেরত রাখবেনা সে। এইসকল ঠ্যাক-মারা পোলাপান তার দোকানে আর না আসলেও ক্ষতি নাই। অন্তত আজকের ক্ষতিটা ত পুষিয়ে নেয়া যাবে। বিভ্রান্ত করার জন্য এইবার মারণাস্ত্র ছুড়ল সুফিয়া। এক লোকমা বিরানি প্লেট থেকে তুলে মুখে চালান করে দিলো। সংগে সংগে পেট বিদ্রোহ করে উঠল, গন্ধ হয়ে যাওয়া বিরানি মুখে দেওয়ার অপরাধে পেট সকালের পান্তাভাতগুলোকেও বের করে দিতে চাইল। কিন্তু সুফিয়া দ্রুত কয়েকবার মুখ নেড়ে পেটে চালান করে দিলো বিরানিটা। কষ্ট করে মুখের অভিব্যাক্তিও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। গ্রাহক দুইজনের চেহারাতে কিছুটা স্বস্তি আসলো মনে হয় এইবার। সুফিয়ার পাশে বসে বসে এতক্ষন সবকিছু পর্যবেক্ষন করছিলো তার ৬ বছরের মেয়ে আকলিমা। হঠাত চিৎকার করে বসলো সে, “আইসক্রিম খাইয়াম,আম্মা”। পেটের ভিতরে বাসি বিরানির স্বাদের সাথে মেয়ের এই আইসক্রিমের আবেদনটিও বাসি লাগলো সুফিয়ার। এক ধমক দিলো মেয়েকে, চুপ ছেড়ি। সারাদিন ধমকের উপর থাকা আকলিমার গায়ে সেটি স্পর্শ করলোনা। আইসক্রিম খাইয়াম আম্মা,ঐ যে আইসক্রিমওয়ালা। ইশারা দিয়ে রাস্তার ঐপারে কিছুক্ষন আগে দাঁড়ানো পোলার আইসক্রিমের ভ্রাম্যমান দোকানটির দিকে মায়ের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করলো সে। সুফিয়ার পাকস্থলি তখনও বিদ্রোহী আওয়াজ দিয়ে যাচ্ছিলো ,আওয়াজের সাথে প্রতিবাদের চিহ্নস্বরুপ কিছু গ্যাসিয় পদার্থ বের করতে চাচ্ছিলো মুখ দিয়ে। মেয়েকে এইবার একটি চড় বসিয়ে দিলো সুফিয়া। চড়ের প্রতিবাদ হওক বা আইসক্রিমের ভালোবাসার টানে হওক, আকলিমাও প্রতিবাদ জানিয়ে কান্না শুরু করলো। পাকস্থলির প্রতিবাদে কিছু করার না থাকলেও ৬ বছরের মেয়ের প্রতিবাদের অনেক কিছুই করার ছিলো সুফিয়ার। হাতের প্লেটটি ফুটপাতের উপর রেখে চুল ধরে ধাম ধাম করে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো মেয়ের পিঠে আর ঘাড়ে। সর্বশেষে মুখে একটি চড় কষিয়ে বললো, আর করবি এমন? একবার না করলে আর চাইবে কোনোদিন? হঠাত বয়ে যাওয়া এই সাইক্লোনের হাত থেকে বাঁচার জন্য আপাতত আইসক্রিমের মোহকে জলাঞ্জলি দিতেই হলো আকলিমার। মাথা দুইদিকে দুলিয়ে “না” স্বরূপ ইংগিত করে ঝাপসা চোখে আইসক্রিমের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

-ঐ মিয়া কিয়ের গান্দা? এই যে খাইলাম আমি। কই আমার কাছে ত গান্দা লাগলো না। আজাইরা কথা কওয়ার জায়গা পাওনা,না? মেয়েকে মেরে এইবার পুরো ফর্মে চলে এসেছে সুফিয়া। আক্রমন করাই সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা।

-হ,তোমার কাছে গান্দা লাগত ক্যারে? দুই লোকমা খাইয়া আমার পেট কামড়াইতাছে। ভাত ভিইজ্জা গেছেগা,ধরতে গেলেই গইল্যা যায় আর এইডা তোমার কাছে ভালা বিরানি? তোমার বিরানি তুমি খাও। আমি খাইতাম না তোমার দোকানে।

উৎসুক দুই গ্রাহক এইবার ফুটপাত থেকে প্লেটটি তুলে নিয়ে গন্ধ শুঁকে নিলো। পূর্ব হতে জানা থাকলে নষ্ট খাবার নির্নয় করতে সুবিধা হয়। এদেরও হলো। ‘ঐ ভাবী বিরানি ত নষ্ট, চল পাশের ঐটাতে বিরানি আছে ‘ বলে পাশের টং এর দিকে হাঁটা ধরলো তারা। এত অভিনয় করেও ফায়দা হলোনা সুফিয়ার। প্রথম গ্রাহকের উদ্দেশ্যে এইবার সে আরো ভয়ংকর,

-খাইবানা বালা কথা,দাম দিয়া যাও।

-দাম দিতাম ক্যারে? গান্দা বিরানি খাইতে দিছো আবার দাম দিতাম ক্যারে? মগের মুল্লুক নাকি?

-অত কতা কইয়োনা যে, দাম দিতে হইবো। তুমি খাইছো ক্যান? গান্দা হইলে আগেই মানা করতা পারছোনা? এখন খাইছো যখন তখন দাম দিতেই হইবো।

– এ্যাহ। কইলেই হইলো। আমিও দেহি ক্যামনে তুমি দাম নেও। দুই নাম্বার ব্যবসা শুরু করছ, না? খাড়াও তোমার ব্যবসা আমি লাটে তুলুম এইবার। মাইনসেরে দুই নাম্বার জিনিস খাওয়াইয়া ট্যাকা রাখা বাইর করতেছি।

কয়েকটা খালি রিক্সা এসে দাঁড়ালো সুফিয়ার দোকানের সামনে। এরা সুফিয়ার রেগুলার কাস্টমার। এক প্লেট বিরানির জন্য দোকানের ভিতর এমন ঝগড়া করাটা নিরাপদ না এখন। পরে এই কাস্টমারগুলা অন্য দোকানে চলে গেলে তার সবই হারাবে। কিছুটা নরম সুরে বললো তাই সুফিয়া,

-আইচ্ছা যাও। আজকে কিছু কইলাম না আর। এরপর থাইকা সাবধানে খাইবা। অন্য দোকান হইলে বুঝতা।

-হ, অন্যদোকান হইলে তোমার মতো এমন বিরানি খাইতেও দিতোনা। বলে উঠে চলে গেলো কাস্টমার। এদের ঝগড়া,আনন্দ কিছুই বেশিক্ষিন স্থায়ী হয়না। জীবন যেখানে গিরগিটি সেখানে আবেগগুলো রঙ ধরে রাখতে পারবে কেনো?

***********************************

-রহিম ভাই ভালা আছো?
নতুন আসা অতিথিদের আমন্ত্রন জানালো সুফিয়া।

– আর বালা। কী গরমডাই না পরছে। এক্কেবারে পুইড়ালছে আজকে। মাথাত আগুন জ্বলতাছে। ঐ মিলন আমার লাইগা একগ্লাস পানি আনিস।

পানির ড্রামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন রিক্সাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বললো রহিম। পানির গ্লাস নিয়ে পাশে এসে বসলো মিলন।

-কি গো ভাবী, তোমার ছেড়ি কান্দে ক্যারে? আর হেই বেডা এমন চেইত্তা গেলো ক্যারে তোমার দোকান থাইক্কা?

– ছেড়ির আইসক্রিম খাওনের শখ হইছে। আগের কাস্টমারে চলে যাওয়ার কারনটি ব্যাক্ত করার ইচ্ছে নেই সুফিয়ার।

– শখ করছে যহন তহন দেও না একটা আইসক্রিম কিন্যা। রহিম মেয়ের পক্ষালম্বন করলো।

-এইতা বড়লোকি শখ আমাগো মানায় ভাই? একটা আইসক্রিমের দাম ২০/৩০টেহা। এর চাইতে বাড়িত যাইবার টাইমে ৫টেহার সাদা আইসক্রিম কিন্যা দিমুনে তারে।
সুযোগ পেয়ে আকলিমা বলে উঠলো এইবার, ঐযে দেহ, পরী আইসক্রিম খাইতাছে।একটা ডিব্বার ভিতরে আইসক্রিম থাহে সাদা সাদা। ২৫ টেহা দাম। ঐগুলা একটা কিন্যা দেও না আম্মা।

চুপ, আবার? পরী আইসক্রিম খায় তাতে তোর কি? আর পরীর কথা কইতে মানা করছিনা তোরে? মেয়ের পিঠে আরেকটা চড় বসিয়ে দেয় সুফিয়া।
পরীর মা “খারাপ মেয়ে” হিসেবে পরিচিত এই এলাকায়। রাতের বেলা সাজগোজ করে বের হয় আর সকাল বেলা বাসায় আসে। বিয়া হয়েছিলো কবে ক্যা জানে। জামাই ছেড়ে গেলো অনেকদিন আগেই। শোনা যায় বাপ আর ছোট ভাইকে নিয়ে থাকে সে। দেখতে সুন্দরী না হলেও ভরাট শরীর তার। এই লাইনে শরীরে মাংস থাকাটা দরকার বেশি। যতদিন শরীরে মাংস আছে ততদিন খদ্দের খোঁজা লাগেনা,খদ্দেররাই খুঁজে বের করে তাদের। মাংস কমে যেতে থাকলে খদ্দের ধরার জন্য নানা পরিশ্রম করা লাগে এদের। রেট কমাতে হয়,সাজগোজে অতিরিক্ত মন দিতে হয়,খদ্দেরদের হাঁড়ির খবর রাখতে হয় আর সেই সাথে বাকি ‘খারাপ মেয়ে’ যারা আছে তাদের দিকেও চোখ রাখতে হয়। পরীর মায়ের এখন প্রথম কাল চলছে। গতরে গাতরে ভালো হওয়াতে তার খদ্দের পেতে বেগ পেতে হয়না তেমন। একটা মেয়ের ছোটখাটো ইচ্ছা মিটিয়ে বেশ তৃপ্তিই পায় সে। বন্ধু বলো আর সংগী সবকিছুই ত তার এই মেয়ে। খারাপ মেয়েদের সাথে এই বস্তির মানুষগুলোও সহজভাবে মিশতে পারেনা।

পরী শব্দটাতে সবাই যেনো নড়েচড়ে বসলো। পরীর মায়ের খদ্দেরের তালিকাতে রহিম,মিলন প্রথম সাড়িতেই থাকে সবসময়। কিন্তু রহিমও সেই অপ্তবাক্য জানে, ‘আক্রমনই সেরা প্রতিরক্ষা’।

-ঐ মাগির ছেড়ির সাথে আবার তোমার মাইয়া মিশে না ত ভাবী?

-মাথা খারাপ? ঠ্যাং ভাইংগা দিতাম না যদি খালি পরীর লগে মিশতে যায় তাইলে?

-হ। খারাপ মাইয়ার ছেড়ি খারাপই হইবো। এইগুলানের সাথে মিশলে তোমার ছেড়িও হেইতা শুরু করবো। সাবধান মিশতে দিয়োনা যে।

আকলিমাকে পরীর কাছ থেকে দূরে রাখতে পেরে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো বোধহয় রহিম আর মিলন। হাত-মুখ পানিতে ভিজিয়ে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে তাদের সাথে এসে বসলো দুলাল মিয়া। বয়সে এদের সবার বড় দুলাল। বয়স জিনিসটাকে সবাই ‘ক্যাশ’ করতে পারেনা কিন্তু দুলাল মিয়া বেশ ভালোভাবেই করতে পেরেছে এটি। রহিম আর মিলন সকল ক্ষেত্রেই দুলালের কথা মেনে চলে। কোন গ্যারেজ থেকে রিক্সা নেয়া হবে, আজকে পরীর মা নাকি সংসদ ভবনের লাভলীকে ভালোবাসা হবে, অথবা হাউজি,তিন তাস কোন জায়গাতে খেললে নিরাপদে খেলা যাবে, সবকিছুতেই দুলাল মিয়ার কথাকেই সবচাইতে গুরুত্ব দেয় রহিম, মিলন। ঢাকা শহরে দলবাজি করে থাকা লাগে, সে যেই হওক না কেনো। দলছুট হয়ে গেলে আরেকদলের হাতে পরে বিচ্ছিরি কিছু ঘটে যেতে পারে যেকোনো সময়। মানুষ একসাথে থাকে,এটাই জগতের নিয়ম কিন্তু ঢাকা শহরের নিয়ম একটু ভিন্ন। এখানে দলবেঁধে থাকেনা মানুষ,এখানে ‘দলবাজি’ করে থাকে সবাই। এখানে জীবন মানে ‘আক্রমন’ আর ‘প্রতিরক্ষা’ দুটোই। এককথায় এখানের জীবনে ‘যুদ্ধ’ প্রচন্ডভাবে বিদ্যমান। কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে এবার খাবারের দিকে মনযোগ দিলো তারা।

-কি দিমু? জানতে চাইলো সুফিয়া। ভাত খাইবা নাকি বিরানি দিমু?

-বিরানির পাতিল থাইকা ত গন্ধ ছুটছে। দোকানে এসে প্রথম কথা বললো দুলাল মিয়া। ঢাকা শহরে ৩০ বছর থেকে অনেককিছুই রপ্ত করেছে সে। তবে এর মাঝে দূর থেকে মানুষের কথা শুনতে পারাটা সবচাইতে চমৎকার ভাবে করতে জানে সে। এই গুনটি ঢাকা শহরের সবচাইতে জরুরী গুন।দূর থেকে পড়তে না জানলে পুলিশ,ছিনতাইকারী,চোর,বারবনিতাদের অন্যায় আক্রমনের শিকার হতে পারে যে কোনো সময়। রিক্সা চালাতে গিয়ে কম ত দেখলোনা এই জীবনে। রাতের বেলা ঝিম মেরে বসে থাকা ছিনতাইকারি, হঠাত অপরাধ খুঁজতে তৎপর পুলিশ, চমৎকার পোশাকে বিপদে পরা নারীর পিছনে উত পেতে থাকা ডাকাতদের আক্রমন। দেখতে দেখতে এখন সে দূর থেকেই অনেককিছু আঁচ করতে পারে। এই যেমন দোকানে যে বিরানি নিয়ে একটা যুদ্ধ চলছিলো সেটি রহিম,মিলন ধরতে না পারলেও দুলাল মিয়ার চোখ ফাঁকি দেয়নি।

-হ। বিরানিডা মনে হয় একটু টইক্কা গেছে। থাওক আপনাগো বিরানি খাওনের দরকার নাই। ভাত খান। পাংগাস মাছ আনছি আজকে বড় দেইখা। এখনও কেউ খায় নাই ভাত। গরম গরম ভাত আর পাংগাস মাছের ঝোল দিয়া খান। চ্যাপা ভর্তাও আছে,পটলের ভাজিও করছি। জিভে জল নিয়ে আসার মতো করেই মেন্যুগুলো বলে যাচ্ছিলো সুফিয়া। দুলাল মিয়ার প্রতি মিলন আর রহিমের শ্রদ্ধা যেনো আরো বেড়ে গেলো সুফিয়ার স্বীকারোক্তিতে। শ্রদ্ধা জিনিসটা দিন দিন বৃদ্ধি পায়,কারনে অকারনে বৃদ্ধি পায়।

ভাত আর পাংগাস মাছের অর্ডার দিয়ে বিড়ি জ্বালিয়ে বসলো তারা তিনজন। খাবারের আগে বিড়ি খাওয়ার এই অভ্যাসটাও দুলাল মিয়ার কাছ থেকে রপ্ত করছে বাকি দুইজন। এতে নাকি পেটে ‘ভুক’ বাড়ে। রিক্সা চালানোর প্রথম শর্ত হলো বারবার খাওয়া যাবেনা কিন্তু যখন খাবে তখন সহজে থামা যাবেনা। রিক্সা টানা হাল টানার চাইতেও কঠিন কাজ। শুরুর দিকে কষ্ট লাগেনা তেমন কিন্তু কিছুক্ষন রিক্সা টানার পর পা যেনো আর চলতে চায়না। হাল টানার সাথে রিক্সা টানার পার্থক্য হলো গরুর কষ্ট লাগলে দাঁড়িয়ে যায়, কৃষকও হয়ত তখন একটু তামাক টেনে গরুকে জিরানোর সময় দেয়। কিন্তু রিক্সা চালালে দাড়ানোর জো নেই। এখানে গ্রাহক কৃষকের মতো দয়াবান নন। পেটে খাবার না থাকলে তাই বিপদ আছে। তাই বলে বারবার খাওয়া যাবেনা। অর্থের সাথে সাথে রিক্সা টানার যান্ত্রিক ক্ষমতাও তাতে হ্রাস পাবে। অনেক জটিল ব্যাপার এগুলো। ভাগ্যিস দুলাল মিয়া ছিলো তাদের সাথে,তা না হলে ঢাকা শহরে কী বিপদেই না পরা লাগত মিলন আর রহিমের।

একটি রিক্সা চলে গেলো সামনে দিয়ে। হুড তোলা,ভিতরে প্রেমে মত্ত দুইজন ছিলো হয়ত।

-চুতমারানির পোলাপাইনের কাম নাই রিক্সা লইয়া ঘুরব আর বদমাইশি করব। রিক্সা ভাড়া কইরা মনে কয় রাস্তাও কিন্যা ফালাইছে। শরম লেহাজ কিচ্ছু নাই, পারলে রিক্সার মাইঝেই চুইদা ফালায়। অবসর পেলেই গ্রাহকদের চরিত্র বিশ্লেষন করতে বড় ভালো লাগে মিলনের। তপ্ত রোদের মাঝে এই বিনোদনের জন্যই সে প্রতীক্ষা করে থাকে। যতক্ষন বসে থাকে ততক্ষন সে বাকিদের বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করতে থাকে।

-হেইদিন আমার রিক্সায় এমন দুইজন উঠলো। পোলা মনে কয় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির আর ছ্যামড়ি ইডেন কলেজের। ইডেনের ছ্যামড়িগুলান যে কত্ত খারাপ হয় দুলাল ভাই। রিক্সার ভিত্রে কী যে শুরু করছে দুইটা মিল্যা। আমি ত লজ্জায় মইরা যাই যাই অবস্থা। হেরপর টিএসসিতে লইয়া গেলাম দুইটারে। কীরকম আকাম করা শুরু করছে যে হুশও নাই কই যাইতাছে। টিএসসিতে ঢাকা বার্সিটির পোলাপাইনে ধইরা পরে দুইটারা আটকায়ে কী যে করলো হে হে হে । মাঝে মাঝে কল্পিত কাহিনী গড়ে রিক্সার আরোহণকারীদের একটা উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চেষ্টা করে মিলন। কিন্তু গল্প বানাতে পারারা নিদারুন ব্যার্থতা এই সুযোগটিও দেয় না তাকে। সরাসরি না বললেও চেহারা থেকে বোঝা যায় তার গল্পে খুব একটা আনন্দ পায়নি দুলাল বা রহিম। তবে পাশের দোকানে চা খেতে বসা এক প্রৌঢ় উৎসাহিত হয়ে যোগ দিলো মিলনের সাথে। ঠিক কইছেন ভাই, ‘এইসব বেশরম পোলাপাইনের লাইগা রাস্তায় হাঁটতেও লজ্জা লাগে’ বলে মিলনের পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি। এই সকল বেয়াদপ ছেলে-মেয়ের মা-বাবাকে অভিসম্পাত করে মিলনের সাথে সখ্য গড়ে নিলেন তিনি। তখনই আরেকটা রিক্সা করে এক তরুণী যাচ্ছিলো। ওড়নাটা ঠিক জায়গামতো ছিলোনা হয়ত। রোদের হাত থেকে বাঁচতে ঢাকার তরুণীরা রিক্সার হুড অথবা মাথায় স্কার্ফ ব্যবহার করলেও এই তরুণীটির সেই দিকে ভ্রুক্ষেপ ছিলোনা।

-দেখছেন কাড়বার? ওড়না যদি গলাতেই দিবি তাইলে ওড়না ক্যান পরস? বুক খুইলা সবাইরে দেখাইতে দেখাইতে যা। কয়েকটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষনের পিছনে এই তরুণীটির অবদান সবাইকে জানিয়ে দিলেন নতুন যুক্ত হওয়া ভদ্রলোকটি।

তিনটি প্লেটে ভাত আর পরিমান মতো চ্যাপা-শুটকি ভর্তা দিয়ে পাংগাস মাছ তুলছিলো সুফিয়া। তখনই কথাগুলো কানে গেলো তার। মুখ নিচু করে নিজের বুকের দিকে তাকালো সুফিয়া। বয়স তার ৩৫ এর উপর হবে। বিগত যৌবনা বলা উচিৎ হবেনা এখনই। কাজ করতে গিয়ে কখন বুকের উপর থেকে কাপড়টি সরে গিয়েছে সেই খেয়াল ছিলোইনা তার। ব্লাউজের ফাঁক গলে উঁচু হয়ে থাকা মাংসের দলা পথচারিদের দেখার আমন্ত্রন জানাচ্ছিলো। তবে এটিই রক্ষা যে ফুটপাতের শরীর মানুষের দৃষ্টিকে তেমন একটা বিচলিত করেনা যতটুকু করে রিক্সা,গাড়ি বা পার্কের শরীর। পুরুষের চোখ শুধু শরীরই খুঁজেনা, শরীরের সাথে মর্যাদাও খুঁজে। অর্থবিত্ত,শিক্ষা অথবা চোখের সুখের জন্য নিদেনপক্ষে সুন্দর কাপড় … কিছু একটা থাকা লাগবে মর্যাদাপূর্ণ। পুরুষের চোখ অত সস্তা না।তবুও শাড়ির আঁচল টেনে নিজের আব্রু রক্ষা করলো সুফিয়া। ভাতের প্লেটগুলো বাড়িয়ে দিলো সে।

কয়েকপ্লেট ভাত মেরে দেবার জন্য চ্যাপাশুটকি ভর্তা উত্তম খাবার। নামেই শুটকি থাকে তাতে,মূলে থাকে কাঁচামরিচ। বেশি করে লবন নিয়ে নিমেষেই এক প্লেট ভাত সাবাড় করে ফেললো তিনজন। পাংগাস মাছ খাওয়ার আগে আরেক প্লেট করে ভাত খেয়ে ফেলতে প্লেটগুলো আবার বাড়িয়ে দিলো দুলাল মিয়া। তখনই বসে বসে ভাতের প্লেটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে হঠাত রাস্তার ঐপাড়ে চোখ গেলো রহিমের।

-তোমার ছ্যাড়ি হেইপারে গেলো ক্যামনে গেলোগো ভাবী?

এতক্ষন নিজের শরীর আর বিরানি বিক্রি করার চিন্তায় আকলিমার কথা ভুলেই গিয়েছিলো সুফিয়া। তাই ত ! তার মেয়ে রাস্তা পাড় হয়ে ঐ পাড়ে কখন গেলো সেটি টেরই পায়নি সে। হাতে একটি আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আকলিমা। হে আইসক্রিম পাইলো কই? কাউকে উদ্দেশ্য করে না, আপন মনেই বললো সুফিয়া।
-ঐ যে দেহো এক ছ্যাড়া আর ছ্যাড়ি দাঁড়াইয়া কাইজ্জা করতাছে। ছ্যাড়ি মনে হয় রাগ কইরা আইসক্রিম ফালাইয়া দিছে। হেইডাই তোমার ছ্যাড়ির হাতো। চায়ের দোকান থেকে গল্পে যোগ দিতে আসা প্রৌঢ় বললেন কথাগুলো।

– আকলিমা এই দিকে আয়। ঐ হারামজাদি আকলিমা এক্ষন এইহানে আয় কইলাম। ভাতের প্লেট ফেলে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো সুফিয়া তার মেয়েকে।
আকলিমার সেই দিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। ৪৫টাকা দামের কোন আইসক্রিম খাবার তার অনেকদিনের শখ। পরী তার কাছে গল্প করেছে সেই আইসক্রিমের। আইসক্রিমে নাকি বাদাম থাকে,কিসমিস থাকে। খাইতে বিদেশী চকলেটের মতো লাগে। বিদেশী চকলেট কখনও না খেলেও পরে থাকা ‘কোন আইসক্রিম’ দেখে বিদেশী চকলেটের স্বাদ নিতে কার্পন্য করার মতো সাহস তার নেই। সুফিয়ার চিৎকারে তাই সাড়া দিলোনা আকলিমা। ঐ পাড়ে গেলে এমনিতেও মারবে ,ওমনিতেও মারবে। এর চাইতে আইসক্রিম খেয়েই মার খাওয়াটা তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হলো।

-আকলিমা, এক্ষন এইদিকে আয় কইলাম। আজকে তোর পিঠে আমি দশটা লাডি ভাংগমু। হারমজাদি ছ্যাড়ির কত বড় সাহস। আকলিমা আকলিমা এই দিকে আয় এক্ষন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেশ উচ্চস্বরেই কথাগুলো বলে গেলেন সুফিয়া। চিৎকার তার রাস্তার ঐ পাড়ে চলে গিয়েছে ততক্ষনে। আকলিমা না শুনলেও প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করতে থাকা যুবকটির কানে গেলো সুফিয়ার চিৎকার। পিছন ফিরে দেখলো তার কেনা আইসক্রিম হাতে নিয়ে আরাম করে খাচ্ছে ময়লা জামা পরা এক মেয়ে। প্রেমিকার রাগটা এইবার আকলিমার উপর গিয়ে চাপল সেই যুবকের।

– ঐ ছ্যাড়ি,ঐ। আইসক্রিম ফালা। হারামজাদি আইসক্রিম ফালা কইলাম। চেঁচিয়ে উঠলো যুবকটি।

-ঠিকি আছে। তোমার আইসক্রিম এরেই খাওয়া উচিৎ। এমন বস্তির মেয়ের সাথেই তোমার প্রেম করা উচিৎ। আমার মতো মেয়ে তোমার কপালে জুটা ঠিক না। ফোড়ন কাটার সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক মনে করলোনা যুবতিও।

পৌরুষে আঘাত পাওয়ার জন্য কথাগুলো যথেষ্ট ছিলো। বান্ধবিকে কিছু করা সম্ভব না কিন্তু বস্তির যে মেয়েটির জন্য তাকে ‘বস্তির জামাই’ বানিয়ে দেয়া হলো তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া খুব সম্ভব।

-ঐ মাইয়া দাঁড়া। বলে আকলিমার দিকে দৌড়ে আসতে লাগল যুবকটি।

সুফিয়া দেখতে পেলো পিছন থেকে ছুটে আসা উন্মাদ যুবকটিকে।

– আকলিমা, মা এইদিকে আয়। জলদি এই দিকে আয়। চিৎকার করে উঠলো সুফিয়া।

আদরের ডাক শুনে কিছুটা বিচলিত হয়ে মায়ের দিকে তাকালো আকলিমা। হঠাত বুঝতে পারলো পিছনে ভয়ংকর কিছুর দিকে ইংগিত করে মা ডাকছে তাকে। ঘাড় ঘুড়িয়ে প্রেমোন্মাদ যুবকটিকে দেখে দৌড় লাগালো আকলিমা। কোনো অবস্থাতেই এই আইসক্রিম সে হাতছাড়া করতে রাজী না। জীবনে এই জিনিস আবার কবে পাবে তার নিশ্চয়তা কেউ দেয়নি তাকে। হাতে আইসক্রিমটি নিয়ে পাখির মতো ছুট দিলো আকলিমা। রাস্তা পারাপারের ব্যাকরণ জানা থাকলেও সেটি প্রয়োগ করার মতো যথেষ্ট সময় তার হাতে ছিলোনা। সামনের দিকে দৃষ্টি থাকাতে বিয়ে করতে তাড়া থাকা একটি প্রাইভেট কার তার চোখে পড়লই না। ছোট্ট আকলিমার শরীরটিকে ফুট চার পাঁচ দূরে নিয়ে আছড়ে ফেললো হবু বরকে পরিহন করতে থাকা গাড়িটি। আকলিমার শরীরের ছোঁয়া পেয়ে বিয়ের তাড়া আরো বেড়ে গেলো যেনো। এক ছুটে দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেলো ফুল দিয়ে সাজানো গাড়িটি। রক্ত ভেজা হাড়ভাংগা শরীর নিয়ে মায়ের দিকে একবার তাকালো আকলিমা। মাকে ডাকার শক্তি ছিলোনা অতটুকুন শরীরে। ঠিক তখনই আসছিলো বিকল্প পরিবহনের একটি বাস। আকলিমার ছোট্ট শরীরটার উপর দিয়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিলোনা বাসটির।

সাদা আইসক্রিম আর লাল রক্তে পিচের রাস্তায় অদ্ভুত এক শিল্পের আবির্ভাব হলো।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: