Leave a comment

শরীয়া আইনের অবসেশন

সৌদিআরবে ৮ বাংলাদেশির হত্যা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে ফেসবুক, ব্লগ সহ সকল জায়গায়। এর পক্ষেও মত পাওয়া যাচ্ছে যে, তারা অন্যায় করেছে তাই শাস্তি ভোগ করেছে।আচ্ছা ধরুন, আমাদের এই মানুষগুলো সৌদিয়ারবে না গিয়ে ইন্ডিয়া, আমেরিকা তে যেয়ে যদি একি অন্যায় করত এবং সেই সব দেশে যদি এইরকম আইন থাকত এবং তারা যদি আমাদের ৮জন নাগরিককে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে, বাসায় গিয়ে পোলাও কোর্মা পেটে ঠুসত আর বউ বাচ্চাকে রসিয়ে রসিয়ে বাংগালী গুলার ‘মাথাটা’ কিভাবে কাটা গেল, মরার আগে তারা কিভাবে ‘শয়তানের’ মত আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল তাদের মুখটা মরার আগে দেখতে এলাকার কোন ‘কুত্তা’ টার মত হয়েছিল সে বর্ননা দিত , তাহলে আমদের কিরকম প্রতিক্রিয়া হত?১৪ এর জায়গায় ১৮ গোষ্ঠি উদ্ধার করাতে নেমে যেতাম এই কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা অবশ্যই।

আবার আমদের সুশিল সমাজের প্রতিনিধীরা অনেকেই এইটা সৌদি সরকারের বর্বরতা, পাশবিকতা হেন তেন বলে যাচ্ছে , কিন্তু এর ‘রুটের’ দিকে তাকিয়েও না দেখার ভান করে যাচ্ছেন।আর এর পক্ষবাদিরা একে স্বমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন , কারন এটা আল্লহর আইন। কথা সত্য, অত্যন্ত সত্য। এটা অবশ্যই আল্লাহর আইন।এই আইন সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও ক্ষুদ্র। কিন্তু কিছু জানার চেষ্টা করলাম।

শরিয়া আইন বিশ্লেষনের আলোচনায় হাদিস শাস্ত্রই বেশি জরুরি, কোরআন না। কোরআন মানে শরিয়া না। কোরআন মুসলমানদের প্রধান ধর্মপুস্তক। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত বলে যা পরিচিত তাতে কোরআনের চেয়ে হাদিসের প্রাধান্য অনেক বেশি। এর কারন, কোরআন আলাদাভাবে কোন আইন পুস্তক না, এতে আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ, ঘটনা প্রবাহ, আগের আমলের কাহিনী, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি বহুকিছুর সন্যিবেশ আছে, আইন বিষয়ে পরিস্কার নির্দেশ এই পুস্তকে কম। দ্বিতীয়ত, কোরআন আইনের মূখ্য উৎস হিসেবে কিভাবে ব্যাবহৃত হবে সেইটাও হাদিস শাস্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত। কোরআনের কোন আয়াতের কি অর্থ, এতে কি কি শরিয়তী সুস্পষ্ট আইন আছে, এর প্রয়োগ কিভাবে করা যায় এইসবই হাদিস শাস্ত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত। আবার হাদিস এর অথেন্টিকেশন নিয়েও প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক না। কারন হয়েছে মোহাম্মদ (সঃ) সবচাইতে পুরাতন যে জীবনিগ্রথটি পাওয়া যায় তা ১৫০ বছর পুরাতন । আর হাদিসগুলো সংগৃহিত হয়েছে ২৫০/৩০০ বছর পর। তাই যে মেথডে যত প্রচেষ্টা করাই হোক না কেন তাতে যে কিছু প্রব্লেম থেকেই যায়।

শরিয়া হল মোসলমানের কোড অফ কন্ডাক্ট। ডেইলি রূটিন , খাদ্যাভ্যাস, কাপড়পরিধান,চিত্তবিনোদন,খেলাধুলা থেকে শুরু করে রাজনিতী,অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সব কিছুরজন্যই একজন মোসলমানকে এই শরিয়া আইন মেনে চলতে হবে।তাই সকল ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে গেলে ‘বিষাদ সিন্ধু’ লিখে ফেলতে হবে। আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিছু অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে তুলে ধরব।

শরিয়া আইন মূলত ৩টা ক্যাটাগোরিতে বিভক্ত।

১। কিসাস

২। হুদুদ

৩। তাজির।

কিসাস’ হচ্ছে রক্তপাতের বদলা বা প্রতিশোধ।কিসাসে মূলত হত্যাপ্রচেষ্টা, অঙ্গহানি এইসব ব্যাপারি নিয়েই বিচার হয়ে থাকে।আর এতে ভিক্টিমের দাবি অনুযায়ি বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।অর্থাত ভিক্টিম যদি চায় তাহলে অপরাধি তার যে অংগহানি করেছে সে অপরাধির সেই অংগ দাবি করতে পারে, ব্লাড মানি নিয়ে অপরাধিকে ছেড়ে দিতে পারে, অথবা একদম মাফ করে দিতে পারে । ‘হুদুদ’ এ যে ব্যাপারগুলোর বিচার হয় তা হলো চুরি, যেনাহ(বিবাহবহির্ভূত শারিরিক সম্পর্ক)ইসলাম ধর্ম ত্যাগ,রাষ্ট্রদ্রোহিতা সমকামিতা, মদ পান এইসকল অন্যায় এই ক্যাটাগরিতে পরে এবং এর জন্য হাদিস অনুযায়ি নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান আছে। তবে এইসকল অন্যায়ের শাস্তির ক্ষেত্রে সাক্ষ্যপ্রমানটাই মুখ্য। সার্কামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স এইক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। তাই অনেক ইরাক, ইরান সহ অনেক দেশে এই অপরাধের বিচার গুলো ‘তাজির’ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করে। সেখানে সাক্ষ্য প্রমান ছাড়াও অন্যান্য এভিডেন্স কে আমলে এনে আপরাধিকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা প্রদান করা হয়। অন্যান্য বিচার প্রক্রিয়া থেকে শরিয়া বিচার প্রক্রিয়ায়র মৌলিক পার্থক্য হলো যে এইখানে মৌখিক সাক্ষ্যই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আবার এই ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ আছে।সাক্ষি ভালো চরিত্রের লোক কিনা তা দেখতে হবে,বিধর্মি হলে তার সাক্ষ্য গ্রহন করা হবেনা সাক্ষি যদি মহিলা হন তবে ২ জন মহিলা লাগবে।

এইবার আসুন কিছু অপরাধ এবং তৎজন্য শাস্তির বিধানগুলো একটু দেখে নেই

চুরি

নিচে দুটি হাদিস দেয়া হল:

1.The Prophet said, “The hand should be cut off for stealing something that is worth a quarter of a Dinar or more.” Volume 8, Book 81, Number 780: Narrated ‘Aisha

2: The Prophet cut off the hand of a thief for stealing a shield that was worth three Dirhams.( . Volume 8, Book 81, Number 788 Narrated Ibn ‘Umar)

প্রয়োজন মনে করিনি বলে আর হাদিস দিলামনা। লেখার নিচে লিঙ্ক দেয়া আছে চাইলে দেখে নিতে পারেন।

যেনাহ(বিবাহবহির্ভুত শারিরিক সম্পর্ক)

যেনাহকারির জন্য একমাত্র শাস্তি হচ্ছে পাথর ছুড়ে হত্যা করা, এ ব্যাপারে হাদিস

The Jew brought to the Prophet a man and a woman from amongst them who have committed (adultery) illegal sexual intercourse. He ordered both of them to be stoned (to death), near the place of offering the funeral prayers beside the mosque.” (Narrated ‘Abdullah bin ‘Umar :Volume 2 book23 no413)

ধর্ষন

ধর্ষনের ব্যাপারে শরিয়াতে সরাসরি মৃত্যুদন্ডের কথা উল্লেখ আছে। এইখানে আমি সে প্রসংগে কোন হাদিস উল্লেখ করলামনা। কিন্তু আবার এই কথাও উল্লেখ আছে যে ধর্ষনকারী ধর্ষিতাকে দেনমোহর পরিমান টাকা দিয়েও বেচে যেতে পারে। এই সম্পর্কে একটি হাদিস

A rapist is obliged to pay the victim the amount typically received as marriage payment to similar brides.(Shafi’i Law Reliance of the Traveler -# m.8.10)

তবে ধর্ষনের ব্যাপারে সবচাইতে সমস্যাপূর্ন যে জিনিসটা তা হলো এর বিচার প্রক্রিয়া। মেয়েটি যে সত্যই ধর্ষিত হয়েছে এই ব্যাপারটা প্রমানের জন্য ডি এন এ টেস্ট বা মেয়েটির শারিরীক অবস্থাই মুখ্য না, এইখানে ৪জন প্রকৃত মোসলমান সাক্ষি লাগবে ধর্ষনটি প্রমানের জন্য। কিন্তু ৪ জন সাক্ষি রেখে কে ধর্ষন করে? সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ধর্ষনটি প্রমানিত না হওয়ায় উলটা মেয়েটিকে যেনা, বা একা একা বাইরে যাওয়া এইসব নানাবিধ কারনে উলটা শাস্তি পেতে হয়।যার অনেক উদাহরনও আছে আমাদের সামনে।সোমালিয়াতে কিছুদিন আগে এক কিশোরিকে রেপ করার পর শরিয়া আদালতে তা প্রমান করতে না পারায় উলটা মেয়েটিকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। সৌদিয়াতে এইরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। এর পিছনে আসল কারন আইনের ফাক।

হত্যা

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য হত্যার ব্যাপারে কিসাসের বিধান লিখে দেয়া হয়েছে। (১৭৬) স্বাধীন ব্যক্তি হত্যা করে থাকলে তার বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, দাস হত্যাকারী হলে ঐ দাসকেই হত্যা করা হবে, আর নারী এই অপরাধ সংঘটিত করলে সেই নারীকে হত্যা করেই এর কিসাস নেয়া হবে। (১৭৭) তবে কোন হত্যাকারীর সাথে তার ভাই যদি কিছু কোমল ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয়, (১৭৮) তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী (১৭৯)রক্তপণ দানের ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সততার সঙ্গে রক্তপণ আদায় করা হত্যাকারীর জন্য অপরিহার্য। এটা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে দন্ড হ্রাস ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে (১৮০) তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। – বাকারা-১৭৭

এছাড়া

নারীর ক্ষমতায়ন নিষিদ্ধ

যুদ্ধের পর ঐ এলাকার নারীদের নিজের সম্পত্তি হিসাবে গন্য করা

দাসির সাথে শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন কে বৈধতা দান

অবাধ্য হলে স্ত্রীকে স্বামির মারধোর করার অধিকার

এই সকল আইন নিয়ে আর আলোচনা করলামনা এই স্বল্প পরিসরে

সামজিক বিধি বিধানগুলো একটা নির্দৃষ্ট সময় কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। কিন্তু আমরা যদি কোন আচার, কানুনকে universal ভেবে নিই তাহলেই গোল বাধে, সেটা যেই নিয়মই হোক না কেন। ইসলাম ধর্ম যেহেতু সৌদিআরবে বিস্তার লাভ করেছিল তাই ইসলামের আইন কানুনে ঐ সময়ের সৌদিআরবে যে সকল আচার প্রচলিত ছিল সেইগুলার প্রতিফলন ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক। ইহুদিদের মধ্যে eye for eye , teeth for teeth এই নিয়ম প্রচলিত ছিল অনেক দিন ধরেই, তাই তার প্রতিফলন আমরা ইসলামেও দেখি। সেই মধ্যযুগিয় নিতী থেকে আমরা সরে এসেছি অনেকদিন হয়েছে, কিন্তু মোসলমান হিসাবে ইসলাম এর শাস্তির বিধানগুলোর প্রতি দূর্বলতা আছে অনেকের।আমাদের ধারনা, প্রকাশ্যে এইরকম শাস্তি হলে আমারা ভয়ে আর পাপ করবোনা। কিন্তু শাস্তি দিয়ে অন্যায় ঠেকানোর প্রচেষ্টা খুবি হাস্যকর চিন্তা।এইটা সম্ভব হলে মুসলিম জাহানে ১৪০০ বছেরে কেন সবাই অন্যায় করা ছেড়ে দিলনা। ধর্মে পাপের জন্য ‘নরক’ এর পূন্যের জন্য ‘স্বর্গ’ এর ব্যবস্থা করা আছে। তা দেখে কতজন পাপ করা ছেড়ে দিয়েছে? আসলে পাপ পূন্য এইগুলো ভয় বা লোভ দেখিয়ে করানো যায়না এর জন্য দরকার মনুষত্ব বোধ।

আর শরিয়া আইনের আরেকটা ভয়ঙ্কর দিক হলো, এটি হবে পাব্লিক ট্রায়াল, মানে বিচার হবে জনস্মমুখ্যে। ভাবা হয়, এইরকম হলে মানুষ ভয় পাবে, এইটাও একটা ভুল কনসেপ্ট। মানুষ এইগুলো নিয়মিত দেখে দেখে তখন আর ভয় পায়না বরং একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পায়। গ্লেডিয়েটররা বাঘের সাথে ফাইট করে মারা যাবে এই দৃশ্য দেখার জন্য গ্রীসে মানুষ টিকেট কেটে মাঠে যেত, সে কি ভয় পাওয়ার জন্য না বিনোদনের জন্য?

আর আরেকটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো এই আইনের অপপ্রয়োগ। সৌদি বাদশাহরা ইন্ডিয়া ,আম্রিকা,ইংল্যান্ডের মানুষের, তাদের দেশের রাঘব বোয়ালদের বিচার না করলেও আমাদের বিচার ঠিকি করে। রেপ হওয়া মেয়েকে পাথর মেরে মেরে ফেলে কিন্তু রেপিস্টের কিছু হয় না। এরকম অনেক উদাহরন আমাদের গ্রামে গঞ্জেও আছে। বলতে পারেন এরকম অন্য জায়গাতেও হয়, কিন্তু ভাই কেউকে গলা কেটে মেরে ফেললে, পাথর মেরে মেরে ফেললে বা হাত কেটে ফেললে এর কি রিফান্ড দেয়া সম্ভব?

হিন্দু ধর্মে একসময় ‘সতিদাহ’ এর মত বর্বর প্রথা ছিল, খ্রিষ্টানরা ডাইনি উপাধি দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে হাজার হাজার নারীকে। কিন্তু এইসব প্রথা এখন বিলুপ্ত। সময়ের প্রয়োজনেই বিলুপ্ত। সময়ের প্রয়োজনে এখন যদি ইসলাম ধর্মের এই সব আইনগুলোকে আমরা এখনো সকল সময়ের জন্য পারফেক্ট আইন মনে করে চালিয়ে যেতে চাই তাহলে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে আর কতটুকু wise thinking হবে সে বিচার ইতিহাসি করবে।

তথ্যসূত্র

http://en.wikipedia.org/wiki/Sharia

http://www.faithfreedom.org/op-ed/hadiths-on-stoning-in-islam/ যেনাহ কারির শাস্তির হাদিস সমূহ

http://ishwar.com/islam/holy_hadith/book81/ চুরি ও ডাকাতির উপর হাদিস সমূহ

 

নোটঃ সৌদিয়ারবে একজনকে হত্যার দায়ে আট বাংলাদেশীকে হত্যার পরে ব্লগটি লেখা হয়েছিলো

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: